July 5, 2026, 6:40 pm
শিরোনামঃ
মুখস্ত বিদ্যা জ্ঞানহীনতার পরিচয় মতলব দক্ষিণে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ, প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত মতলব উত্তরে সরকারি রাস্তা নির্মাণে বাধার অভিযোগ, ভোগান্তিতে চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ সুন্দরবনে হরিণ শিকারের অভিযোগে চারজন আটক ; বন বিভাগের অভিযানে জব্দ ফাঁদ ও কাঁকড়া এখনই পদক্ষেপ নিন : জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে প্রজনন মৌসুমেও সুন্দরবনে মৎস্য নিধনের অভিযোগ ; বন বিভাগের একাংশের বিরুদ্ধে যোগসাজশের দাবি গ্রামবাসীর সর্বসম্মত সমর্থনে ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা এম ইলিয়াছ আলীর মতলব উত্তরে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে দোকান পুড়ে ছাই ; গরু দগ্ধ হয়ে নিহত সাগর উত্তাল : ইলিশের ভরা মৌসুমে অনিশ্চয়তায় উপকূলের হাজারো জেলে মতলব উত্তরে মাকে হ.ত্যা করে কলাবাগানে ফেলে রাখে ছেলে, ৮ দিন পর গ্রেপ্তার

মুখস্ত বিদ্যা জ্ঞানহীনতার পরিচয়

Reporter Name

মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত জ্ঞানচর্চার ইতিহাস। আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ প্রযুক্তি কিংবা দর্শন—সবকিছুর পেছনে কাজ করেছে প্রশ্ন করার সাহস, পর্যবেক্ষণের অভ্যাস এবং চিন্তা করার ক্ষমতা। মানুষ কেবল তথ্য মুখস্থ করে আজকের অবস্থানে পৌঁছায়নি; বরং সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ করেছে, ভুল সংশোধন করেছে, নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং প্রয়োগের মাধ্যমে জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। অথচ আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি শিক্ষাসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে মুখস্থ করাকেই মেধার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়াকে জ্ঞান মনে করা হয়, অথচ বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তিবোধ এবং সৃজনশীলতাকে অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই বলা যায়—মুখস্ত বিদ্যা জ্ঞানহীনতার পরিচয়।

এ বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে মুখস্থ করার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের স্মৃতিশক্তি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভাষা শেখা, গণিতের সূত্র, আইন, ধর্মীয় গ্রন্থ, কবিতা কিংবা বৈজ্ঞানিক পরিভাষা—অনেক কিছুই মনে রাখতে হয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন মুখস্থ করাকেই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা হয়। যে শিক্ষা মানুষকে ভাবতে শেখায় না, প্রশ্ন করতে শেখায় না, যুক্তি বিশ্লেষণ করতে শেখায় না, বাস্তবে প্রয়োগ করতে শেখায় না—সে শিক্ষা কেবল তথ্যের ভার বহন করে; জ্ঞান সৃষ্টি করে না। একজন মানুষ হয়তো শত শত সংজ্ঞা মুখস্থ বলতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি সেই সংজ্ঞার বাস্তব অর্থ ব্যাখ্যা করতে না পারেন, তবে তাঁর জ্ঞান অসম্পূর্ণ। আবার কেউ হয়তো একটি তত্ত্বের ভাষা হুবহু বলতে পারবেন না, কিন্তু যদি তিনি তার মূল ধারণা বুঝে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে তিনিই প্রকৃত শিক্ষিত। কারণ শিক্ষা মুখের শব্দ নয়; চিন্তার রূপান্তর।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সংকট হলো, অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের উত্তর শেখানো হয়; কিন্তু প্রশ্ন করার কৌশল শেখানো হয় না। একজন শিক্ষার্থীকে বলা হয়—এভাবেই লিখতে হবে, এভাবেই বলতে হবে, এভাবেই উত্তর দিতে হবে। ফলে তার নিজস্ব চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সে পরীক্ষায় সফল হতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে।

বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও উদ্ভাবকেরা মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেননি। তাঁরা প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন। তাঁরা ভেবেছেন, পরীক্ষা করেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের জ্ঞান জন্ম নিয়েছে অনুসন্ধিৎসা থেকে, অন্ধ অনুকরণ থেকে নয়। যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজে নতুন জ্ঞান জন্মায় না। সেখানে শুধু পুরোনো তথ্যের পুনরাবৃত্তি হয়।

ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কেউ হয়তো অসংখ্য ধর্মীয় উদ্ধৃতি মুখস্থ বলতে পারেন, কিন্তু যদি সেই শিক্ষার নৈতিকতা তাঁর আচরণে প্রকাশ না পায়, তবে মুখস্থ জ্ঞানের মূল্য সীমিত হয়ে যায়। আবার একজন মানুষ হয়তো কম জানেন, কিন্তু যা জানেন তা আন্তরিকভাবে বুঝে পালন করেন—তাঁর জ্ঞান অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে। কারণ জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষকে পরিবর্তন করা, শুধু স্মৃতিকে ভারী করা নয়। বর্তমান কর্মক্ষেত্রেও মুখস্থবিদ্যার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আজ একজন প্রকৌশলীকে শুধু সূত্র জানলেই চলে না; তাকে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে হয়। একজন চিকিৎসককে শুধু বইয়ের ভাষা মুখস্থ থাকলেই হয় না; রোগীর অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন বিচারককে শুধু আইন জানা নয়; ন্যায়বিচারের চেতনা ধারণ করতে হয়। একজন সাংবাদিককে শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়; তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণও করতে হয়। অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্ঞানের প্রয়োগই আসল।

ডিজিটাল যুগে তথ্যের অভাব নেই। একটি মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো তথ্য পাওয়া যায়। তাই আজ মুখস্থ করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্যকে যাচাই করার ক্ষমতা, সত্য-মিথ্যা আলাদা করার দক্ষতা এবং প্রাপ্ত তথ্যকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার প্রজ্ঞা। যে ব্যক্তি এসব দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তিনিই আধুনিক বিশ্বের প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ।

মুখস্থবিদ্যা অনেক সময় আত্মপ্রবঞ্চনারও কারণ হয়। একজন ব্যক্তি মনে করেন তিনি অনেক জানেন, কারণ তিনি অনেক তথ্য বলতে পারেন। কিন্তু যখন তাঁকে সেই তথ্যের কারণ, প্রেক্ষাপট বা প্রয়োগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন দেখা যায় তাঁর জ্ঞান ভাসাভাসা। ফলে আত্মবিশ্বাস থাকলেও গভীরতা থাকে না।

পরিবারেও শিশুদের এমন পরিবেশ দেওয়া উচিত, যেখানে তারা প্রশ্ন করতে পারে। “এটা কেন?”, “কীভাবে?”, “যদি এমন হতো?”—এই প্রশ্নগুলিই ভবিষ্যতের গবেষক, উদ্ভাবক এবং চিন্তাবিদ তৈরি করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় শিশুদের প্রশ্নকে বিরক্তির কারণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে তারা ধীরে ধীরে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। অথচ যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, সে-ই একদিন নতুন উত্তর খুঁজে পায়। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেষ করলেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রকৃত শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেন। তিনি উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি ভাবতে শেখান। তিনি বলেন না, “শুধু এটা মুখস্থ করো”; বরং বলেন, “এটা কেন সত্য, তা বোঝার চেষ্টা করো।”

একইভাবে একজন অভিভাবকেরও দায়িত্ব সন্তানকে নম্বরের প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে শেখার আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। কারণ নম্বর সাময়িক; কিন্তু শেখার অভ্যাস আজীবনের সম্পদ। ইতিহাসে অনেক মেধাবী মানুষ পরীক্ষায় প্রথম হননি। আবার অনেক পরীক্ষার প্রথম হওয়া মানুষ ইতিহাসে বিশেষ অবদান রাখতে পারেননি। কারণ পরীক্ষা সব সময় মানুষের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা বা উদ্ভাবনী শক্তির পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারে না। তাই কেবল ফলাফল দিয়ে মেধার বিচার করাও ঠিক নয়।

আমাদের সমাজে প্রায়ই বলা হয়—”ছেলেটি খুব মেধাবী, কারণ সব মুখস্থ বলতে পারে।” কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—সে কি বুঝে বলতে পারে? সে কি নতুন কিছু চিন্তা করতে পারে? সে কি শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে? যদি উত্তর না হয়, তবে সেই শিক্ষা এখনও পূর্ণতা পায়নি।

জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে বড় শত্রু অহংকার। যে ব্যক্তি মনে করেন তিনি সব জানেন, তিনি আর নতুন কিছু শেখেন না। আর যে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত শিখতে চান, প্রশ্ন করেন, ভুল স্বীকার করেন, তিনি ক্রমাগত উন্নত হন। তাই জ্ঞান মানে শুধু তথ্য নয়; শেখার মানসিকতাও। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমালোচনামূলক চিন্তা (critical thinking), সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সহযোগিতামূলক কাজের মানসিকতা। এগুলোর কোনোটিই শুধু মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। এগুলোর জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, অনুশীলন এবং গভীর উপলব্ধি।

মুখস্থবিদ্যা কখনো কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু সেটিই যদি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তাহলে মানুষ তথ্যের ভাণ্ডার হতে পারে, জ্ঞানের মানুষ হতে পারে না। সমাজ তখন সনদধারী লোক পায়, কিন্তু চিন্তাবিদ পায় না; পরীক্ষায় সফল মানুষ পায়, কিন্তু উদ্ভাবক পায় না; বক্তা পায়, কিন্তু প্রজ্ঞাবান নেতা পায় না। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক মূল্যবোধে পরিবর্তন আনা জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে—মুখস্থ করার আগে বোঝো, বোঝার পরে প্রশ্ন করো, প্রশ্নের পরে অনুসন্ধান করো, আর অনুসন্ধানের পরে বাস্তবে প্রয়োগ করো। এভাবেই জ্ঞান জীবন্ত হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায়, মুখস্ত বিদ্যা জ্ঞানহীনতার পরিচয়”—এই বক্তব্যের মর্মার্থ মুখস্থবিদ্যার সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি নয়; বরং মুখস্থকে শিক্ষার শেষ ধাপ মনে করার বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা। স্মৃতি প্রয়োজন, কিন্তু স্মৃতির সঙ্গে যুক্তিবোধ না থাকলে শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। তথ্য প্রয়োজন, কিন্তু তথ্যের সঙ্গে প্রজ্ঞা না থাকলে সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে। সনদ প্রয়োজন, কিন্তু সনদের সঙ্গে চরিত্র, দক্ষতা এবং বাস্তবজ্ঞান না থাকলে সেই সনদ সমাজের খুব বেশি উপকারে আসে না। প্রকৃত শিক্ষা সেই শিক্ষা, যা মানুষকে শুধু উত্তর মুখস্থ করায় না; বরং নতুন প্রশ্ন করার সাহস দেয়, সত্য অনুসন্ধানের শক্তি দেয় এবং মানবকল্যাণে জ্ঞানকে কাজে লাগানোর প্রেরণা জাগিয়ে তোলে।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা