বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ শিকারে যাওয়া হাজারো জেলে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ভরা মৌসুমের শুরুতেই এমন পরিস্থিতিতে ইলিশ আহরণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন উদ্যমে সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন উপকূলের হাজারো জেলে। তবে প্রবল পূবালী বাতাস, উত্তাল ঢেউ এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা সাগরে অবস্থান করতে না পেরে ট্রলার নিয়ে উপকূলে ফিরে আসেন। বর্তমানে সুন্দরবন সংলগ্ন মেহেরআলী, আলোরকোল, ভেদাখালীসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলে শত শত মাছ ধরার ট্রলার নোঙর করে রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে জীবনের ঝুঁকি এড়াতেই জেলেরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জেলে ও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞা শেষে অধিকাংশ জেলে ঋণ কিংবা মহাজনের দাদনের টাকা নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরতে না পেরে ফিরে আসায় তারা এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বাগেরহাটের বগা এলাকার ফিশিং বোটের মাঝি নজরুল ইসলাম জানান, গত দুই দিন ধরে সাগরে ঢেউ ও বাতাসের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে ট্রলার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে অবস্থান করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে রায়েন্দা, মহিপুর, খেপুপাড়া, পাথরঘাটা ও উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার খাল ও নদীতে আশ্রয় নেওয়া জেলেরা এখন আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। মাছ ধরতে না পারায় ট্রলারের জ্বালানি, রসদ এবং শ্রমিকদের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রলার মালিকরা। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মৌসুমের শুরুতেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা অনেক আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের ফিরে আসতে হয়েছে। এতে জেলে ও ট্রলার মালিক উভয়ই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলারকে সাগরে যেতে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। জেলেদের নিরাপত্তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জেলেদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো বিশেষ আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
মৎস্য সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈরী আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জেলেদের জীবিকাই নয়, দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে। এতে ইলিশের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের আবহাওয়া ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাই জেলেদের জন্য আধুনিক আবহাওয়া সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়ের সুবিধা এবং দুর্যোগকালীন আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
উপকূলের জেলেরা এখন একটাই প্রত্যাশা করছেন—আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক হোক, যাতে আবারও সাগরে নেমে মৌসুমের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ আহরণ করে পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে পারেন।