July 9, 2026, 7:26 pm
শিরোনামঃ
জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণা-যাত্রার অন্তরালের গল্প সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের চাপে আত্মসমর্পণ বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সদস্যের কোটচাঁদপুরে পোস্ট অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি মতলব উত্তরে অসদুপায়ের দায়ে ৭ এইচএসসি পরীক্ষার্থী বহিষ্কার ও ৫ শিক্ষককে অব্যাহতি  কৃষিজমিতে ড্রেজারের থাবা, প্রশাসনের অভিযানে থামল ভরাট মতলব পৌরসভার ৬৪ কোটি ৩১ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা তৃণমূল পর্যায়ে জনসেবা আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও জনবান্ধব করার নির্দেশনা : জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল ; উপকূলীয় বাগেরহাটে চরম সংকটে মৎস্য খাত বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম- বেসড টিচিং ; লার্নিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত মতলব দক্ষিণ উপজেলায় চার বছরের শিশু ধ.র্ষণ চেষ্টায় যুবক আটক

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণা-যাত্রার অন্তরালের গল্প

Reporter Name

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার যেমন তথ্যপ্রাপ্তিকে সহজ করেছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ তথ্য, অর্ধসত্য কিংবা প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ছাড়া উপস্থাপিত বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শিক্ষা, গবেষণা কিংবা পেশাগত অর্জন নিয়ে আলোচনা যখন হয়, তখন অনেক সময় বিষয়টির গভীরে না গিয়ে কেবল উপসংহার টেনে ফেলা হয়। অথচ একটি গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি—বিশেষ করে পিএইচডি—কীভাবে অর্জিত হয়, তার পেছনে কত বছরের শ্রম, অধ্যবসায়, মানসিক চাপ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর একাডেমিক মূল্যায়ন কাজ করে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা খুবই সীমিত।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েও সময়ে সময়েই আলোচনা হয়েছে। কেউ তাঁর গবেষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, আবার কেউ প্রশ্নও তুলেছেন। কিন্তু কোনো গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত মতামত নয়; বরং একাডেমিক প্রক্রিয়া, গবেষণার মান এবং নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়নই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে প্রশংসা করা বা সমালোচনা করা নয়। বরং একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা কীভাবে দীর্ঘ প্রায় সাত বছরের গবেষণা-যাত্রা সম্পন্ন করে একটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন? সেই যাত্রাপথে তাঁকে কী কী ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে? এবং সেই প্রক্রিয়া কতটা কঠোর ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে তাঁর গবেষণার বিষয়টি কী ছিল। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ যে বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, তার শিরোনাম— “Border Management Challenges of Border Guard Bangladesh (BGB): Issues in Transnational Threat.”

পৃথিবীর কোন দেশে ইতিপুর্ব “Border Management Challenges of Border Guard Bangladesh (BGB): Issues in Transnational Threat.” বিষয়ে কোন গবেষণা হয়নি। শুধু শিরোনামটি দেখলেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ সামাজিক বা তাত্ত্বিক গবেষণা নয়। বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ নিয়ে একটি বিশেষায়িত গবেষণা। গবেষণার বিষয় নির্বাচন থেকেই বোঝা যায়, তিনি এমন একটি ক্ষেত্রকে বেছে নিয়েছেন, যা তাঁর দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ তাঁর কর্মজীবনের লব্দ ব‍্যাপক অভিজ্ঞতার আলোকে গবেষণার বিষয়টি নির্বাচন করেছেন। তিনি বিডিআর/বিজিবি’তে ব‍্যাটালিয়ন কমান্ডার, সেক্টর কমান্ডার এবং চার বছর মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্বপালন করেছেন। তিনি কেবল পিএইচডি ই সম্পন্ন করেননি, বরং তার পুর্বে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স ইন ডিফেন্স স্টাডিজ (এমডিএস) ও এমএসসি (ট‍্যাকনিকাল) এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন বাংলাদেশ (এআইইউবি) থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ অর্জন করেন।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত একটি দেশ। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত, বঙ্গোপসাগর, পার্বত্য এলাকা, সুন্দরবন এবং অসংখ্য সীমান্তপথ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল। এই সীমান্ত দিয়ে বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি মাদকপাচার, মানবপাচার, অস্ত্র চোরাচালান, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং নানা ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও সৃষ্টি হতে পারে। ফলে এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে হলে কেবল বই পড়ে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হয়। এই জায়গাতেই ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা অন্য মাত্রা লাভ করে। কারণ তিনি এই গবেষণার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক থাকাকালীন সময়ে। অর্থাৎ তিনি যখন প্রতিদিন সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত অপরাধ, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, সীমান্ত সম্মেলন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তব সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—এই অভিজ্ঞতাকে গবেষণার মাধ্যমে একাডেমিকভাবে বিশ্লেষণ করবেন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। কারণ বিশ্বের অনেক গবেষক এমন বিষয়ে গবেষণা করেন, যেটি সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান মূলত বই বা তথ্যভাণ্ডারনির্ভর। কিন্তু ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয় এবং কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা একে অপরের পরিপূরক ছিল। তিনি যে সমস্যাগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন, সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গেই তিনি দায়িত্ব পালনের সময় সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি বিজিবির চতুর্থ মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাহিনীর পুনর্গঠন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, সীমান্ত নজরদারি সম্প্রসারণ, সীমান্ত সড়ক নির্মাণের অনুমোদন, নতুন ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা, প্রশিক্ষণ আধুনিকীকরণ এবং বাহিনীর সাংগঠনিক উন্নয়নে তিনি কাজ করেন। তাঁর দায়িত্বকালেই বিজিবির পুনর্গঠন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।  এমন একটি দায়িত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে পিএইচডির প্রস্তুতি গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে সহজ কাজ ছিল না। কারণ একজন বিজিবি মহাপরিচালকের কর্মদিবস কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কর্মকর্তার মতো নয়। সীমান্ত পরিস্থিতি, নিরাপত্তা বৈঠক, বিভিন্ন অপারেশন, সরকারি সভা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ, জরুরি নির্দেশনা—সব মিলিয়ে তাঁর দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত ব্যস্ততাপূর্ণ।

সাধারণভাবে মনে করা হয়, উচ্চপদে থাকা ব্যক্তিদের হাতে হয়তো অনেক অবসর সময় থাকে। বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন বাহিনীপ্রধানের প্রতিটি দিনই পরিকল্পিত বৈঠক, নীতিনির্ধারণ, পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে পরিপূর্ণ থাকে। সেই ব্যস্ততার মাঝেও যদি কেউ নিয়মিত গবেষণার জন্য সময় বের করেন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং অধ্যবসায়ের একটি বিরল উদাহরণ। এখানে আরও একটি ভুল ধারণা ভাঙা প্রয়োজন।

অনেকেই মনে করেন, তিনি সেনাপ্রধান হওয়ার পর পিএইচডি শুরু করেছিলেন। কিন্তু তথ্য বলছে, তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে নয়, বরং বিজিবির মহাপরিচালক থাকাকালীনই পিএইচডি কার্যক্রম শুরু করেন এবং পুরো গবেষণা সম্পন্ন করতে প্রায় সাত বছরেরও বেশি সময় ব্যয় করেন। এই তথ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একটি গবেষণার পেছনে সাত বছরের সময় ব্যয় করা মানে হলো, এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ধারাবাহিক একাডেমিক শ্রমের ফল। একটি পিএইচডি গবেষণার ক্ষেত্রে বিষয় নির্বাচন, গবেষণা পরিকল্পনা, সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, জার্নাল প্রকাশ, সেমিনার, থিসিস রচনা এবং চূড়ান্ত ডিফেন্স—সবকিছুই সময়সাপেক্ষ। অর্থাৎ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের এই দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়েছিল দায়িত্বের শীর্ষে থেকে, কিন্তু শেষ হয়েছিল গবেষকের ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং একাডেমিক মূল্যায়নের সফল সমাপ্তির মধ্য দিয়ে। একজন গবেষকের পিএইচডি যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো গবেষণা শুরু করার পূর্ববর্তী প্রস্তুতি। অনেকেই মনে করেন, গবেষণার বিষয় নির্বাচন করলেই বুঝি পিএইচডি শুরু হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এমন নয়। বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এও পিএইচডি গবেষণা শুরু করার আগে গবেষককে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো গবেষককে গবেষণার জন্য মানসিক, পদ্ধতিগত এবং একাডেমিকভাবে প্রস্তুত করা।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি সরাসরি থিসিস লেখা শুরু করেননি কিংবা তাঁর দায়িত্বপূর্ণ পদমর্যাদার কারণে কোনো বিশেষ ছাড়ও পাননি। বরং তাঁকে অন্যান্য গবেষকের মতোই নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়েছে। পিএইচডি কার্যক্রমের অনুমতি পাওয়ার পূর্বে তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে এক বছরের কোর্সওয়ার্ক সম্পন্ন করতে হয়। এই কোর্সওয়ার্ক ছিল গবেষণা পদ্ধতি, গবেষণা-নৈতিকতা, তথ্য বিশ্লেষণ, একাডেমিক লেখালেখি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের তাত্ত্বিক কাঠামো সম্পর্কে উচ্চতর প্রশিক্ষণ। অর্থাৎ গবেষণা শুরু করার আগে তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ গবেষক হিসেবে প্রস্তুত হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি এই কোর্সে প্রতি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নিয়মিত ছয় ঘণ্টা করে ক্লাস করেছেন। বিষয়টি অনেকের কাছে একটি সাধারণ তথ্য মনে হতে পারে, কিন্তু এর বাস্তব তাৎপর্য অনেক গভীর। একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য সপ্তাহান্তের ক্লাসে উপস্থিত হওয়া যেমন একটি একাডেমিক দায়িত্ব, একজন বাহিনীর প্রধান পর্যায়ের কর্মকর্তার জন্য সেটি ছিল সময় ব্যবস্থাপনার একটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ সরকারি ছুটির দিন মানেই যে একজন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানের ছুটি, বাস্তবে তা নয়। সীমান্ত পরিস্থিতি কখনো ছুটি দেখে না। যেকোনো সময় জরুরি বৈঠক, সীমান্ত উত্তেজনা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। এই ব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিতভাবে ক্লাসে অংশগ্রহণ করেছেন। এটি কেবল উপস্থিতির বিষয় নয়; বরং গবেষণার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতারও প্রমাণ।

অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কি শুধু ক্লাসে উপস্থিত থাকলেই পিএইচডির অনুমতি পান?

উত্তর হলো—না।

বিইউপি’র নিয়ম অনুযায়ী, কোর্সওয়ার্ক শেষে নির্ধারিত বিষয়সমূহে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সেই পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল অর্জনের পরই গবেষককে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ ড. আজিজ আহমেদকেও নির্ধারিত পরীক্ষা দিতে হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক মান অর্জনের পরই তিনি গবেষণা কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন লাভ করেন। এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে যে, তাঁর পিএইচডি যাত্রা শুরুই হয়েছে একটি নিয়মতান্ত্রিক একাডেমিক মূল্যায়নের মাধ্যমে।

গবেষণা শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়

পিএইচডি গবেষণা বলতে অনেকেই শুধু একটি বড় থিসিস লেখাকে বোঝেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গবেষণা হলো একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে গবেষণার প্রশ্ন নির্ধারণ করতে হয়। তারপর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পূর্ববর্তী গবেষণা বিশ্লেষণ করতে হয়। এরপর গবেষণার পদ্ধতি নির্বাচন করতে হয়। তারপর তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ এবং উপসংহারে পৌঁছাতে হয়।

এই প্রতিটি ধাপেই গবেষককে যুক্তি, তথ্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

ড. আজিজ আহমেদের গবেষণার বিষয় ছিল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা। এই ধরনের গবেষণায় শুধুমাত্র বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করলেই হয় না; বরং নীতি, আইন, সীমান্ত বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষণ—সবকিছুকে সমন্বিত করতে হয়। ফলে গবেষণাটি ছিল স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ।

ISSN জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ—গবেষণার গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

পিএইচডি গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো গবেষণার ফলাফলকে একাডেমিক সমাজের সামনে উপস্থাপন করা। এই উদ্দেশ্যেই গবেষকরা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা থেকে তিনটি পৃথক গবেষণাপত্র ২০১৭-২০১৮ সালে বিভিন্ন ISSN প্রাপ্ত জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই তথ্যটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ISSN (International Standard Serial Number) প্রাপ্ত জার্নাল বলতে এমন সাময়িকীকে বোঝায়, যেগুলো নির্দিষ্ট প্রকাশনা মান বজায় রেখে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। একটি গবেষণাপত্র সেখানে প্রকাশের আগে সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা মূল্যায়িত হয়। গবেষণার তথ্য, বিশ্লেষণ, সূত্র, পদ্ধতি এবং উপসংহার গ্রহণযোগ্য না হলে সেই গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ পায় না। অর্থাৎ গবেষণাপত্র প্রকাশ পাওয়া নিজেই গবেষণার একটি একাডেমিক স্বীকৃতি। ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রে তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হওয়া প্রমাণ করে যে, তাঁর গবেষণা কেবল থিসিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা গবেষণা সমাজেও উপস্থাপিত হয়েছে। এটি একজন গবেষকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

গবেষণাপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য কী?

অনেকেই মনে করেন, গবেষণাপত্র প্রকাশ শুধু আনুষ্ঠানিকতা। বাস্তবে এর উদ্দেশ্য অনেক গভীর। গবেষক যখন তাঁর গবেষণার একটি অংশ জার্নালে প্রকাশ করেন, তখন বিশ্বের অন্যান্য গবেষকও সেটি পড়তে পারেন। তাঁরা সমালোচনা করতে পারেন। তাঁরা নতুন মতামত দিতে পারেন। তাঁরা গবেষণাটিকে আরও সমৃদ্ধ করার পরামর্শ দিতে পারেন। অর্থাৎ গবেষণাটি একাডেমিক সমাজের বিচার-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যায়। এই কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণাপত্র প্রকাশকে পিএইচডি গবেষণার অন্যতম শক্তিশালী ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণার ক্ষেত্রেও এই ধাপটি সম্পন্ন হয়েছে। এটি তাঁর গবেষণাকে আরও গ্রহণযোগ্য করেছে।

গবেষণার প্রতিটি ধাপেই ছিল নিয়মতান্ত্রিক অগ্রগতি

একজন গবেষকের সাফল্য শুধু চূড়ান্ত ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তিনি কীভাবে ধাপে ধাপে একাডেমিক মূল্যায়ন অতিক্রম করেছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা যাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—

  • প্রথমে গবেষণার বিষয় নির্বাচন;
  • এরপর কোর্সওয়ার্ক সম্পন্ন;
  • নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ; ( এমন কি করোনাকালীন সময়ও নিয়মিত ক্লাস করেছেন।)
  • পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া;
  • গবেষণা অনুমোদন লাভ;
  • গবেষণা পরিচালনা;
  • ISSN জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ।

অর্থাৎ প্রতিটি ধাপই ছিল একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো ধাপ বাদ দিয়ে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এটাই একটি পূর্ণাঙ্গ পিএইচডি গবেষণার বৈশিষ্ট্য। যারা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তারা জানেন—একটি থিসিসের প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনে অসংখ্য ঘণ্টার পাঠ, তথ্য সংগ্রহ এবং পুনঃলিখনের শ্রম লুকিয়ে থাকে। তাই পিএইচডি ডিগ্রিকে কেবল একটি সার্টিফিকেট হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয় না। এটি মূলত একজন মানুষের দীর্ঘ অধ্যবসায়, গবেষণামনস্কতা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতীক। ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম ছিল না। বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি এই দীর্ঘ একাডেমিক যাত্রা সম্পন্ন করা তাঁর জন্য আরও কঠিন ছিল। তবুও তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেছেন। আর সেই কারণেই তাঁর পিএইচডি যাত্রা কেবল একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং সময় ব্যবস্থাপনা, অধ্যবসায় এবং গবেষণার প্রতি অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। একজন গবেষকের জন্য গবেষণা সম্পন্ন করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হলো সেই গবেষণাকে একাডেমিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করা। কারণ পিএইচডি গবেষণার মূল উদ্দেশ্য শুধু একটি থিসিস লেখা নয়; বরং সেই গবেষণাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে তা বিশেষজ্ঞদের কঠোর মূল্যায়নেও টিকে থাকতে পারে। এই কারণেই বিশ্বের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিভিন্ন ধাপে সেমিনার, প্রেজেন্টেশন, প্রি-সাবমিশন এবং চূড়ান্ত ডিফেন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়। এসব ধাপের প্রতিটির উদ্দেশ্য একটাই—গবেষণার মান নিশ্চিত করা এবং গবেষকের জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও গবেষণার গভীরতা যাচাই করা।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণার ক্ষেত্রেও এই একাডেমিক প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। অনেকেই শুধু চূড়ান্ত ডিগ্রির কথাই জানেন, কিন্তু সেই ডিগ্রি অর্জনের আগে তাঁকে কতগুলো একাডেমিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা খুব কম মানুষই জানেন।

প্রি-সাবমিশনের আগে তিনটি পৃথক গবেষণা সেমিনার

পিএইচডি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল গবেষণার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে একাডেমিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপন করা। ড. আজিজ আহমেদ তাঁর থিসিস জমা দেওয়ার পূর্বে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এ তিনটি পৃথক গবেষণা সেমিনার সম্পন্ন করেন। এটি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। বরং প্রতিটি সেমিনার ছিল গবেষণার একটি নির্দিষ্ট ধাপের মূল্যায়ন। প্রথম সেমিনারে সাধারণত গবেষণার কাঠামো, গবেষণা-প্রশ্ন, উদ্দেশ্য, গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং গবেষণা-পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় সেমিনারে গবেষণার অগ্রগতি, তথ্য সংগ্রহের অবস্থা, বিশ্লেষণের প্রাথমিক ফলাফল এবং গবেষণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। তৃতীয় সেমিনারে গবেষণার প্রায় পূর্ণাঙ্গ রূপ, উপসংহার এবং সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়, যাতে গবেষণাটি চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যায়।

এই সেমিনারগুলোতে গবেষককে তাঁর গবেষণার প্রতিটি অংশের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে হয়। উপস্থিত অধ্যাপক, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, সমালোচনা করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। গবেষককে তথ্য, যুক্তি এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হয়। অর্থাৎ, একটি সেমিনার গবেষকের জন্য যেমন জ্ঞান যাচাইয়ের ক্ষেত্র, তেমনি গবেষণার মান উন্নয়নেরও একটি কার্যকর পদ্ধতি। ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও এই তিনটি সেমিনার সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই তাঁর গবেষণা পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হয়। এটি প্রমাণ করে যে, গবেষণাটি ধাপে ধাপে একাডেমিকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে এবং প্রতিটি ধাপ পেরিয়েই তিনি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন।

গবেষণা মানেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাহস

একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি তাঁর গবেষণাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে ভয় পান না। কারণ গবেষণা কখনো একমুখী বক্তব্য নয়; এটি তথ্য, যুক্তি এবং প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা একটি একাডেমিক নির্মাণ।

ড. আজিজ আহমেদের গবেষণার বিষয় ছিল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় হুমকি—যা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে তাঁর গবেষণার প্রতিটি বক্তব্যের পেছনে তথ্যগত ভিত্তি, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় থাকা ছিল অত্যন্ত জরুরি। সেমিনারগুলো সেই বিষয়গুলোকেই যাচাই করার সুযোগ তৈরি করে।

থিসিস জমা দেওয়ার আগে ডিফেন্স বোর্ড: সবচেয়ে কঠিন একাডেমিক পরীক্ষা

পিএইচডি গবেষণার শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো থিসিস ডিফেন্স। অনেক গবেষক এই পর্যায়কে পিএইচডি যাত্রার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ এখানে গবেষকের পুরো গবেষণা একসঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়।

ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও থিসিস জমা দেওয়ার পূর্বে একটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ডিফেন্স বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তাঁদের মধ্যে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই বিষয়টির তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো গবেষণার মূল্যায়নে বহিরাগত বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা হলে গবেষণার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হয়। একজন আন্তর্জাতিক বা বিদেশি বিশেষজ্ঞ গবেষণাটিকে কেবল স্থানীয় প্রেক্ষাপটে নয়, আন্তর্জাতিক একাডেমিক মানদণ্ডেও মূল্যায়ন করেন। এর ফলে গবেষণার মান সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়। ডিফেন্স বোর্ডে গবেষককে তাঁর থিসিসের প্রতিটি অধ্যায় ব্যাখ্যা করতে হয়। কেন এই বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে, গবেষণার উদ্দেশ্য কী, কোন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কতটা, গবেষণার সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং গবেষণার ফলাফল কীভাবে রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হয়। এখানে মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ নেই। গবেষণার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি উপসংহার সম্পর্কে গবেষককে গভীর ধারণা রাখতে হয়। কারণ বোর্ডের সদস্যরা শুধু তথ্য নয়, গবেষকের চিন্তাশক্তি এবং বিশ্লেষণী সক্ষমতাও মূল্যায়ন করেন।

পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের আগে সকল নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ

ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি অর্জনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাঁকে ডিগ্রি প্রদানের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত সকল নিয়মকানুন এবং একাডেমিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। বরং এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, গবেষণার প্রতিটি ধাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কোর্সওয়ার্ক, পরীক্ষা, গবেষণা অনুমোদন, গবেষণাপত্র প্রকাশ, সেমিনার, থিসিস জমা, ডিফেন্স—সবকিছুই নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়ার পরই তাঁকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এখানে একটি বাস্তব বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির একাডেমিক অর্জন নিয়ে ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রশ্ন বা বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাই একজন সাধারণ গবেষকের মতোই তাঁকেও প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় একাডেমিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি কোনো বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত একাডেমিক নিয়ম অনুসরণ করেই অর্জিত হয়েছে।

গবেষণার মান যাচাইয়ের গুরুত্ব

বর্তমান বিশ্বে পিএইচডি ডিগ্রির মূল্য নির্ধারিত হয় গবেষণার মানের ওপর। কোনো গবেষক যদি নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেন, তাহলে তাঁর গবেষণা একাডেমিক গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধাপে ধাপে গবেষণার মান যাচাই করে। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। গবেষণার প্রতিটি ধাপ মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে গেছে। গবেষণাটি একাধিকবার উপস্থাপিত হয়েছে। গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত ডিফেন্সে কঠোর প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে গবেষণার মান যাচাই করা হয়েছে। এসব বিষয় একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর পিএইচডি অর্জনের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত আগ্রহই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা-শৃঙ্খলা এবং কঠোর একাডেমিক মূল্যায়নের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া কাজ করেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, একটি গবেষণাভিত্তিক পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন কেবল একটি সনদ লাভের বিষয় নয়; এটি একজন গবেষকের জ্ঞান, ধৈর্য, সময় ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণার প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।

একটি পিএইচডি ডিগ্রির প্রকৃত মূল্য কেবল সনদপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সেই গবেষণা কতটা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেছে, কতটা বাস্তব সমস্যার সমাধানের পথ দেখিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য কতটা ভিত্তি তৈরি করেছে—এসব বিষয়ই একটি গবেষণার প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারণ করে। একজন গবেষকের নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর গবেষণার একাডেমিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আনুষ্ঠানিক একাডেমিক কার্যক্রম ছিল না; বরং তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সীমান্ত নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং গবেষণামূলক বিশ্লেষণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা।

বাস্তব অভিজ্ঞতা একাডেমিক গবেষণার সমন্বয়

অনেক গবেষণাই সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আবার অনেক গবেষণা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণার বিশেষত্ব ছিল—এই দুই ধারার সমন্বয়। তিনি যখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তব সমস্যাগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সীমান্তে মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত অপরাধ, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের কার্যক্রম, প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়—এসব বিষয় ছিল তাঁর দায়িত্বের অংশ। পরে তিনি সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে একাডেমিক গবেষণার আলোকে বিশ্লেষণ করেন। ফলে তাঁর গবেষণায় কেবল তত্ত্ব নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতারও প্রতিফলন ঘটে। এই কারণেই গবেষণাটি সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ে আগ্রহী গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

গবেষণা থেকে গ্রন্থ রচনা—জ্ঞানকে বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়া

একজন গবেষকের কাজ কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস জমা দিয়েই শেষ হয়ে যায় না। গবেষণার ফলাফলকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া একজন গবেষকের নৈতিক দায়িত্বও বটে। ড. আজিজ আহমেদ তাঁর গবেষণার ধারাবাহিকতায় “Transnational Threat: Challenges for Border Management of Bangladesh Perspective” শীর্ষক একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন। এই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ অনেক পিএইচডি গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কিন্তু একটি গবেষণা যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন সেটি গবেষক, শিক্ষার্থী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ পাঠকদের কাছেও সহজলভ্য হয়ে ওঠে। এর ফলে গবেষণার ব্যবহারিক মূল্যও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেই জায়গা থেকে এই ধরনের গবেষণাগ্রন্থ ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।

পিএইচডি কি শুধুই একটি ডিগ্রি?

সমাজে প্রায়ই একটি ভুল ধারণা দেখা যায়—পিএইচডি মানেই একটি উচ্চতর ডিগ্রি। আসলে বিষয়টি এত সরল নয়। পিএইচডি একটি গবেষণা-প্রক্রিয়া। এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার একটি একাডেমিক যাত্রা। এটি প্রশ্ন করার, তথ্য সংগ্রহের, বিশ্লেষণ করার এবং যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর একটি দীর্ঘ পথ। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা-যাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি এই পথের প্রতিটি ধাপই অনুসরণ করেছেন। তিনি—

  • গবেষণার বিষয় নির্বাচন করেছেন;
  • দীর্ঘ সময় গবেষণা পরিচালনা করেছেন;
  • কোর্সওয়ার্ক সম্পন্ন করেছেন;
  • নিয়মিত ক্লাস করেছেন;
  • পরীক্ষা দিয়েছেন;
  • গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন;
  • সেমিনার উপস্থাপন করেছেন;
  • ডিফেন্স বোর্ডে গবেষণা উপস্থাপন করেছেন;
  • একাডেমিক অনুমোদনের পর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

এই প্রতিটি ধাপ একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গবেষণা মানেই অবিরাম শেখা

একজন প্রকৃত গবেষকের শিক্ষা কখনো শেষ হয় না। ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞানচর্চা থেমে যায় না। ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। পিএইচডি অর্জনের পরও তিনি গবেষণা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেননি। বর্তমানে তিনি “Military Diplomacy: Bangladesh Perspective” বিষয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। এই তথ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা সাধারণত তাঁরা করেন, যারা নিজ নিজ গবেষণা-ক্ষেত্রে আরও গভীর জ্ঞানচর্চা করতে চান এবং নতুন গবেষণার মাধ্যমে সেই ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করতে আগ্রহী। অর্থাৎ তাঁর কাছে শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ডিগ্রি অর্জন নয়, জ্ঞান অর্জনই তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য—এমন ধারণা এখান থেকে পাওয়া যায়।

সমালোচনা বনাম একাডেমিক মূল্যায়ন

বর্তমান সময়ে জনপরিচিত ব্যক্তিদের প্রায় প্রতিটি অর্জনই জনআলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে কোনো একাডেমিক ডিগ্রির মূল্যায়ন হওয়া উচিত একাডেমিক মানদণ্ডে। কেউ একজন জনপ্রিয়, প্রভাবশালী অথবা বিতর্কিত—এসব বিবেচনায় নয়। ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি অর্জনের ক্ষেত্রে যে তথ্যগুলো পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—

তিনি দীর্ঘ সময় গবেষণা করেছেন।

বাধ্যতামূলক কোর্সওয়ার্ক সম্পন্ন করেছেন।

নিয়মিত ক্লাস করেছেন। ( এমন কি করোনাকালীন সময়ও নিয়মিত ক্লাস করেছেন।)

পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন।

গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।

তিনটি গবেষণা সেমিনার সম্পন্ন করেছেন।

পাঁচ সদস্যের ডিফেন্স বোর্ডের সামনে গবেষণা উপস্থাপন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল একাডেমিক নিয়ম অনুসরণ করেছেন।

এই প্রক্রিয়াগুলো একটি গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো গবেষণা সম্পর্কে মতামত দেওয়ার আগে এই একাডেমিক বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

একটি অনুপ্রেরণার গল্প

জীবনের একটি পর্যায়ে অনেকেই মনে করেন—এখন আর নতুন করে পড়াশোনা করার সময় নেই। কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রকৃত শিক্ষার্থী কখনো শেখা বন্ধ করেন না। ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা-যাত্রা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও তিনি নিজের জ্ঞানচর্চাকে থামিয়ে রাখেননি। ব্যস্ততা, দায়িত্ব, সময়ের সীমাবদ্ধতা—এসবের মধ্যেও তিনি গবেষণার জন্য সময় বের করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে সময় ব্যবস্থাপনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অধ্যবসায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সফল মানুষেরা সাধারণত সুযোগের অপেক্ষা করেন না; বরং সুযোগ তৈরি করেন। তাঁর গবেষণা-যাত্রা সেই বার্তাই বহন করে। একজন মানুষের জীবনের সাফল্য কেবল তাঁর অর্জিত পদ-পদবি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং তিনি জ্ঞানচর্চা, আত্মোন্নয়ন এবং সমাজের জন্য কতটা ইতিবাচক অবদান রেখে গেছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একজন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব যখন কর্মব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার মতো দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক অভিযাত্রায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন, তখন সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণা-যাত্রার পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—এই ডিগ্রি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় এবং এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি একাডেমিক কার্যক্রমের ফলও নয়। বরং এটি ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম, ধারাবাহিক অধ্যয়ন, নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা এবং একাধিক একাডেমিক মূল্যায়নের সফল সমন্বয়। আমরা যদি পুরো গবেষণা-যাত্রার ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখতে পাই—

প্রথমত, তিনি এমন একটি গবেষণার বিষয় নির্বাচন করেন, যা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় হুমকি নিয়ে গবেষণা করার সিদ্ধান্ত কেবল একটি একাডেমিক পছন্দ ছিল না; বরং দীর্ঘ প্রশাসনিক ও অপারেশনাল অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বাস্তব সমস্যাকে গবেষণার আওতায় আনার প্রচেষ্টা ছিল।

দ্বিতীয়ত, তিনি এই গবেষণা শুরু করেছিলেন সেনাপ্রধান হওয়ার পরে নয়; বরং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে। অর্থাৎ গবেষণার সূচনা হয়েছিল বাস্তব দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর গবেষণার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, গবেষণা শুরু করার আগে তাঁকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর বাধ্যতামূলক কোর্সওয়ার্ক সম্পন্ন করতে হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ছয় ঘণ্টা করে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ, নির্ধারিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক মান অর্জনের পরই তিনি গবেষণার অনুমোদন লাভ করেন। অর্থাৎ গবেষণার সূচনাতেই তাঁকে একজন সাধারণ গবেষকের মতো একই একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

চতুর্থত, গবেষণার ফলাফলকে একাডেমিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি ২০১৭-১৮ সালে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনটি গবেষণাপত্র ISSN-প্রাপ্ত জার্নালে প্রকাশ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, তাঁর গবেষণা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা বৃহত্তর গবেষণা অঙ্গনেও উপস্থাপিত হয়েছিল।

পঞ্চমত, তিনি গবেষণার অগ্রগতি উপস্থাপনের জন্য বিইউপি-তে তিনটি পৃথক গবেষণা সেমিনার সম্পন্ন করেন। এসব সেমিনারে গবেষণার কাঠামো, তথ্য, বিশ্লেষণ এবং উপসংহার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন ও মতামতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একজন গবেষকের জন্য এই ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই গবেষণার শক্তি ও দুর্বলতা উভয়ই চিহ্নিত হয়।

ষষ্ঠত, থিসিস জমা দেওয়ার পূর্বে তাঁকে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ডিফেন্স বোর্ডের সামনে গবেষণা উপস্থাপন করতে হয়েছে। বোর্ডে দেশীয় শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন। অর্থাৎ গবেষণার মূল্যায়ন শুধু অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক একাডেমিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই তাঁর গবেষণা যাচাই করা হয়।

সপ্তমত, পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত সকল নিয়মকানুন, একাডেমিক প্রক্রিয়া এবং আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়। গবেষণার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই তাঁকে চূড়ান্তভাবে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়—ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি কোনো একদিনের অর্জন নয়; বরং প্রায় সাত বছরের দীর্ঘ গবেষণা-যাত্রার সমাপ্তি।

একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবন সাধারণ মানুষের মতো নয়। তাঁর প্রতিটি দিন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নীতিনির্ধারণ এবং অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকে। সেই জীবনযাত্রার মধ্যেও গবেষণার জন্য নিয়মিত সময় বের করা, বইপত্র অধ্যয়ন করা, তথ্য সংগ্রহ করা, গবেষণাপত্র লেখা, সেমিনারে অংশ নেওয়া এবং একাধিক একাডেমিক মূল্যায়নের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা নিঃসন্দেহে কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। এই জায়গাতেই ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা-যাত্রা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তিনি গবেষণা শেষ করেই থেমে যাননি। বরং তাঁর গবেষণার বিষয়কে আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে “Transnational Threat: Challenges for Border Management of Bangladesh Perspective” শীর্ষক একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে তিনি বৃহত্তর সমাজ ও গবেষকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি “Military Diplomacy: Bangladesh Perspective” বিষয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, তাঁর কাছে শিক্ষা ও গবেষণা কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা। আজকের সমাজে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়—আমরা অনেক সময় কোনো ব্যক্তির অর্জনের চূড়ান্ত ফলাফল দেখি, কিন্তু সেই অর্জনের পেছনের দীর্ঘ সংগ্রাম দেখি না। একটি পিএইচডি ডিগ্রির পেছনে যে হাজার হাজার ঘণ্টার অধ্যয়ন, অসংখ্য বইপত্র পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ, সংশোধন, পুনর্লিখন, সেমিনার, মূল্যায়ন এবং মানসিক চাপ কাজ করে, তা সাধারণত জনসমক্ষে আসে না।

ড. আজিজ আহমেদের গবেষণা-যাত্রা আমাদের সেই অদৃশ্য অধ্যবসায়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে একটি বিষয়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গবেষণার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত সেই গবেষণার একাডেমিক মান, পদ্ধতি, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। গবেষণা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা কিংবা মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনা যেন তথ্য, যুক্তি এবং একাডেমিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়—এটিই একটি সুস্থ গবেষণা-সংস্কৃতির লক্ষণ। এই আলোচনায় যে তথ্যগুলো উপস্থাপিত হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে অন্তত এটুকু বলা যায় যে, ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণা একটি দীর্ঘ, নিয়মতান্ত্রিক এবং বহুস্তরীয় একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কোর্সওয়ার্ক, পরীক্ষা, গবেষণাপত্র প্রকাশ, সেমিনার, ডিফেন্স এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন—এসব ধাপ অতিক্রম করেই তিনি এই ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, পিএইচডি শুধু একটি একাডেমিক উপাধি নয়; এটি একজন মানুষের অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা, জ্ঞানপিপাসা এবং গবেষণামনস্কতার প্রতীক। একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেও যদি জ্ঞানচর্চাকে অব্যাহত রাখেন, নতুন গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে একাডেমিক জ্ঞানে রূপান্তর করার চেষ্টা করেন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে অনুসরণীয় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। দায়িত্ব মানুষকে বড় করে, কিন্তু জ্ঞান তাকে স্থায়ী মর্যাদা দেয়। আর সেই কারণেই বলা যায়—পিএইচডি কেবল একটি ডিগ্রি নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মনিয়োগ এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানসাধনার দীর্ঘ অভিযাত্রার আরেকটি নাম।

 

তথ্যসূত্র :

১। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) – Research Repository: “Challenges of Border Guard Bangladesh: Issues in Transnational Threat”। (ড. আজিজ আহমেদের পিএইচডি গবেষণার নিবন্ধিত তথ্য ও গবেষণা প্রকল্পের বিবরণ)। (Bangladesh University of Professionals)

২। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) Newsletter, January 2021। (পিএইচডি ডিগ্রি অনুমোদন, গবেষণার বিষয়, তত্ত্বাবধায়ক, এক্সটার্নাল এক্সামিনার ও প্যানেল সদস্যদের তথ্য)। (Bangladesh University of Professionals)

৩। The Business Standard – “Army Chief obtains PhD degree”, ২৯ নভেম্বর ২০২০। (পিএইচডি অনুমোদন, গবেষণার বিষয়, তত্ত্বাবধায়ক এবং একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত)। (The Business Standard)

৪। Dhaka Tribune – “Army Chief earns PhD”, ২৯ নভেম্বর ২০২০। (পিএইচডি ডিগ্রি অনুমোদন, গবেষণার শিরোনাম এবং মূল্যায়ন বোর্ড সম্পর্কিত তথ্য)। (Dhaka Tribune)

৫। The Financial Express – “Army Chief Gen Aziz earns PhD”, ৩০ নভেম্বর ২০২০। (পিএইচডি গবেষণার বিষয়, এক্সটার্নাল এক্সামিনার এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার তথ্য)। (The Financial Express)

৬। The Asian Age – “Army Chief achieves PhD degree”, ৩০ নভেম্বর ২০২০। (গবেষণা, তত্ত্বাবধায়ক, এক্সটার্নাল এক্সামিনার ও প্যানেল সদস্যদের তথ্য)। (The Asian Age)

৭। New Age – “Bangladesh Army Chief earns doctorate degree”, ২৯ নভেম্বর ২০২০। (পিএইচডি অনুমোদন ও গবেষণা-সংক্রান্ত তথ্য)। (New Age)

৮। Bangladesh University of Professionals – Research List। (বিইউপির গবেষণা তালিকায় “Challenges of Border Guard Bangladesh: Issues in Transnational Threat” অন্তর্ভুক্তি)। (Bangladesh University of Professionals)

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা