May 3, 2026, 2:18 pm
শিরোনামঃ
বই না পড়ার কারণে জাতি হিসাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমরা আজও বহু পিছনে পড়ে আছি! নিজেকে জানো! সুন্নত পালনেই জিয়ারত, বট বাহিনীদের হুঁশিয়ারি মুফতী গিয়াস উদ্দীনের বাগেরহাটে অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল, ব্যাপক ক্ষতির মুখে কৃষক মতলব উত্তরে নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে জেলেদের ভিড়, তবে মিলছে না আশানুরূপ ইলিশ মোংলা–বেনাপোল কমিউটার ট্রেনের ইজারা চুক্তি বাতিল মতলব উত্তর গ্যারেজ মালিক সমিতির নতুন কমিটি ; সভাপতি উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল নির্বাচিত মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সভা ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত নদী ও লেখক আপন গতিতে ইতিহাস রচে ; কারো দানে নয়! এএসপি জাবীর হুসনাইন সানীবের নেতৃত্বে সফল অভিযান ; হজ ক্যাম্পের ২২ হাজার রিয়াল চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার ২, উদ্ধার ১৭,৫০০ রিয়াল

নিজেকে জানো!

Reporter Name

মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে যত দর্শন, যত জ্ঞানচর্চা, যত আধ্যাত্মিক অন্বেষণ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এক গভীর প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে: “আমি কে?” এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানুষের প্রকৃত জাগরণ। “নিজেকে জানো”—এই আহ্বান কেবল একটি বাক্য নয়; এটি একটি জীবনদর্শন, একটি চেতনার বিপ্লব, একটি অন্তর্দৃষ্টি যা মানুষকে তার অস্তিত্বের গভীরে নিয়ে যায়।

মানুষ বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে অসংখ্য জ্ঞান অর্জন করেছে। সে মহাকাশ জয় করেছে, সমুদ্রের গভীরতা মেপেছে, প্রযুক্তির বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই সমস্ত অর্জনের মধ্যেও একটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে—সে নিজেকে কতটুকু চিনেছে? বাহ্যিক জ্ঞানের বিস্তার যতই হোক, যদি আত্মজ্ঞান অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নিজেকে জানার প্রথম ধাপ হলো—নিজের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করা। মানুষ সাধারণত নিজের শক্তিকে অতিরঞ্জিত করে এবং দুর্বলতাকে অস্বীকার করে। এই প্রবণতা তাকে আত্মপ্রবঞ্চনার দিকে নিয়ে যায়। অথচ প্রকৃত আত্মজ্ঞান শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করতে শেখে। এই স্বীকৃতি কোনো পরাজয় নয়; বরং এটি উন্নতির প্রথম পদক্ষেপ। দর্শনের বিভিন্ন ধারায় আত্মজ্ঞানকে সর্বোচ্চ জ্ঞানের আসনে বসানো হয়েছে। কারণ আত্মজ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে—অহংকার থেকে, অজ্ঞতা থেকে, অস্থিরতা থেকে। যখন মানুষ নিজেকে জানে, তখন সে বুঝতে পারে তার আসল চাহিদা কী, তার জীবনের উদ্দেশ্য কী, তার সীমা কোথায় এবং তার সম্ভাবনা কতদূর বিস্তৃত।

মানুষের ভেতরে রয়েছে এক বিস্ময়কর জগৎ—চিন্তা, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল সত্তা। কিন্তু আমরা অধিকাংশ সময় এই ভেতরের জগতকে উপেক্ষা করি। আমরা বাইরের অর্জনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই না। ফলে আমরা এমন একটি জীবন যাপন করি, যা আমাদের নিজের নয়—বরং সমাজের প্রত্যাশা, অন্যের চাপ এবং বাহ্যিক প্রভাবের ফল। নিজেকে জানা মানে নিজের এই ভেতরের জগতকে আবিষ্কার করা। এটি একটি ধীর, গভীর এবং কখনো কখনো কষ্টকর প্রক্রিয়া। কারণ এই পথে হাঁটতে গেলে মানুষকে নিজের মুখোমুখি হতে হয়—তার ভুল, তার ব্যর্থতা, তার অপ্রকাশিত ভয়—সবকিছুর সঙ্গে। কিন্তু এই মুখোমুখি হওয়াই তাকে শক্তিশালী করে।

আত্মজ্ঞান মানুষকে স্বাধীন করে। যখন মানুষ নিজেকে জানে, তখন সে অন্যের মতামতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে না। সে জানে তার মূল্য কোথায়, তার অবস্থান কী। ফলে সে সহজে ভেঙে পড়ে না, আবার অহংকারেও ভেসে যায় না। এই ভারসাম্যই তাকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজেকে জানা মানে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা নয়। বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানুষ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তার অভিজ্ঞতা বাড়ে, তার চিন্তা বিকশিত হয়। তাই আত্মজ্ঞানও একটি চলমান যাত্রা। আজ যে মানুষ নিজেকে যতটুকু জানে, কাল সে তার চেয়ে বেশি জানবে—যদি সে এই অন্বেষণ চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন করার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে কখনোই নিজেকে জানতে পারে না। প্রশ্ন আমাদের চিন্তাকে প্রসারিত করে, আমাদের ভেতরের অজানাকে উন্মোচন করে। “আমি কেন এভাবে ভাবি?”, “আমার এই আচরণের কারণ কী?”, “আমি আসলে কী চাই?”—এই ধরনের প্রশ্নই আত্মজ্ঞানকে গভীর করে।

আধুনিক সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো—আমরা নিজেদেরকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করি। এই তুলনা আমাদের আত্মপরিচয়কে বিকৃত করে। আমরা অন্যের সাফল্য দেখে নিজের মূল্য নির্ধারণ করি, অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে বিচার করি। এতে করে আমরা নিজের স্বতন্ত্রতা হারিয়ে ফেলি। নিজেকে জানার জন্য প্রয়োজন এই তুলনার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা। প্রত্যেক মানুষের জীবন আলাদা, তার অভিজ্ঞতা আলাদা, তার পথ আলাদা। তাই নিজের পথ খুঁজে পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ খুঁজে পেতে হলে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে।

আত্মজ্ঞান মানুষের নৈতিকতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে মানুষ নিজেকে জানে, সে নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকে। সে বুঝতে পারে কোন কাজ সঠিক, কোন কাজ ভুল। এই বোধ তাকে সৎ করে, দায়িত্বশীল করে। একজন আত্মজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ অন্যকে সম্মান করতে শেখে। কারণ সে জানে, প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই একটি আলাদা জগৎ রয়েছে। এই উপলব্ধি তাকে সহনশীল করে তোলে, তাকে মানবিক করে তোলে। নিজেকে জানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আত্মনিয়ন্ত্রণ। যখন মানুষ নিজের অনুভূতি ও প্রবৃত্তিকে বুঝতে পারে, তখন সে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। ফলে সে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয় না, বরং সচেতনভাবে কাজ করে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই তাকে জীবনের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। কারণ সে জানে, প্রতিকূলতা জীবনের অংশ, কিন্তু তা তার সত্তাকে নির্ধারণ করে না।

নিজেকে জানার পথে একটি বড় বাধা হলো—অহংকার। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। সে মনে করে সে সব জানে, তার আর শেখার কিছু নেই। এই মানসিকতা তাকে স্থবির করে দেয়। অন্যদিকে বিনয় মানুষকে শেখার সুযোগ দেয়। যে মানুষ জানে যে সে সব জানে না, সে সবসময় শিখতে প্রস্তুত থাকে। এই প্রস্তুতিই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নিজেকে জানার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার জীবনের উদ্দেশ্যও খুঁজে পায়। এই উদ্দেশ্যই তাকে পথ দেখায়, তাকে অনুপ্রাণিত করে। উদ্দেশ্যহীন জীবন যেমন দিকহীন, তেমনি আত্মজ্ঞানহীন জীবনও অসম্পূর্ণ।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমরা অনেক সময় থামতে ভুলে যাই। আমরা দৌড়াতে থাকি—সাফল্যের পেছনে, অর্থের পেছনে, স্বীকৃতির পেছনে। কিন্তু এই দৌড়ের মধ্যে আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলি। নিজেকে জানার জন্য প্রয়োজন থামা—নিজের সঙ্গে কিছু সময় কাটানো, নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করা। এই সময়টুকুই আমাদের ভেতরের জগতকে উন্মুক্ত করে। একজন মানুষ যখন নিজেকে জানতে শুরু করে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। সে পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখতে শেখে, মানুষকে নতুনভাবে বুঝতে শেখে। তার ভেতরে একটি গভীর শান্তি জন্ম নেয়, যা বাহ্যিক কোনো কিছু দিয়ে অর্জন করা যায় না। এই শান্তিই তাকে স্থিতিশীল করে, তাকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। কারণ সে তখন আর বাইরের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল থাকে না; তার ভেতরেই একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়।

সবশেষে বলা যায়, “নিজেকে জানো”—এই আহ্বানটি একটি চিরন্তন সত্য। এটি কোনো নির্দিষ্ট সময় বা সমাজের জন্য নয়; এটি প্রতিটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য। নিজেকে জানার এই যাত্রা সহজ নয়, কিন্তু এটি সবচেয়ে মূল্যবান। কারণ এই পথেই মানুষ তার প্রকৃত সত্তাকে খুঁজে পায়, তার জীবনের অর্থ খুঁজে পায়। যে মানুষ নিজেকে জানে, সে আর অন্ধকারে থাকে না। তার পথ স্পষ্ট হয়, তার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়, তার জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত—নিজের ভেতরের এই যাত্রা শুরু করা। কারণ শেষ পর্যন্ত, পৃথিবীর সব জ্ঞান, সব অর্জন, সব সাফল্যের মধ্যেও সবচেয়ে বড় জ্ঞান হলো—নিজেকে জানা।

 

লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা