May 3, 2026, 2:22 pm
শিরোনামঃ
বই না পড়ার কারণে জাতি হিসাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমরা আজও বহু পিছনে পড়ে আছি! নিজেকে জানো! সুন্নত পালনেই জিয়ারত, বট বাহিনীদের হুঁশিয়ারি মুফতী গিয়াস উদ্দীনের বাগেরহাটে অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল, ব্যাপক ক্ষতির মুখে কৃষক মতলব উত্তরে নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে জেলেদের ভিড়, তবে মিলছে না আশানুরূপ ইলিশ মোংলা–বেনাপোল কমিউটার ট্রেনের ইজারা চুক্তি বাতিল মতলব উত্তর গ্যারেজ মালিক সমিতির নতুন কমিটি ; সভাপতি উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল নির্বাচিত মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সভা ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত নদী ও লেখক আপন গতিতে ইতিহাস রচে ; কারো দানে নয়! এএসপি জাবীর হুসনাইন সানীবের নেতৃত্বে সফল অভিযান ; হজ ক্যাম্পের ২২ হাজার রিয়াল চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার ২, উদ্ধার ১৭,৫০০ রিয়াল

বই না পড়ার কারণে জাতি হিসাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমরা আজও বহু পিছনে পড়ে আছি!

Reporter Name

একটি জাতির অগ্রগতির মূল শক্তি কী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাই, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং চিন্তার বিকাশই তার ভিত্তি। আর এই জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে সহজ, প্রাচীন এবং কার্যকর মাধ্যম হলো বই। বই শুধু তথ্যের ভাণ্ডার নয়; এটি চিন্তার আলো, বোধের দিগন্ত এবং সভ্যতার ধারক। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আমাদের সমাজে বই পড়ার প্রবণতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, আমরা একটি জাতি হিসেবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছি।

একসময় বই ছিল মানুষের প্রধান সঙ্গী। জ্ঞান অর্জনের জন্য, চিন্তা প্রসারের জন্য, এমনকি বিনোদনের জন্যও মানুষ বইয়ের দ্বারস্থ হতো। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে এসে সেই অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ তথ্য পেতে চায় দ্রুত, সহজ এবং স্বল্প পরিশ্রমে। ফলে বইয়ের গভীর পাঠের পরিবর্তে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি সংক্ষিপ্ত, পৃষ্ঠস্থ এবং দ্রুত গ্রাহ্য তথ্যের প্রতি। এতে করে আমাদের চিন্তার গভীরতা কমে যাচ্ছে, বিশ্লেষণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।

বই পড়া শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য নয়; এটি চিন্তা করার একটি প্রক্রিয়া। যখন কেউ একটি বই পড়ে, তখন সে লেখকের সঙ্গে একটি সংলাপে প্রবেশ করে। সে প্রশ্ন করে, বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে এবং নিজের মতামত তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াই মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু যখন আমরা বই পড়া থেকে দূরে সরে যাই, তখন এই প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একটি বড় সমস্যা হলো—আমরা পড়াশোনাকে শুধু পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। শিক্ষার্থীরা বই পড়ে শুধু ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়। ফলে তাদের মধ্যে পাঠের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় না। তারা বইকে একটি বোঝা হিসেবে দেখে, আনন্দের উৎস হিসেবে নয়। এই মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির জন্য ক্ষতিকর। কারণ একটি জাতি তখনই এগিয়ে যেতে পারে, যখন তার মানুষ প্রশ্ন করতে পারে, নতুন কিছু ভাবতে পারে, সৃজনশীল হতে পারে। আর এই গুণগুলো তৈরি হয় বই পড়ার মাধ্যমে।

বই না পড়ার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে ভাষার ওপর। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি চিন্তার বাহন। যখন মানুষ নিয়মিত বই পড়ে না, তখন তার ভাষা দুর্বল হয়ে পড়ে। সে সঠিকভাবে ভাব প্রকাশ করতে পারে না, তার চিন্তাও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। একটি শক্তিশালী ভাষা একটি শক্তিশালী জাতির পরিচয় বহন করে। কিন্তু আমরা যদি বই থেকে দূরে থাকি, তাহলে আমাদের ভাষার বিকাশও থেমে যাবে। ফলে আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবো না।

বই পড়ার অভাব আমাদের সৃজনশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন সৃজনশীল মানুষ হতে হলে তাকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানতে হয়, বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। বই এই সুযোগটি দেয়। একটি বই আমাদের এমন জগতে নিয়ে যায়, যেখানে আমরা কখনো যাইনি, এমন চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা আমরা আগে ভাবিনি। কিন্তু যখন আমরা বই পড়ি না, তখন আমাদের চিন্তার জগৎ সংকুচিত হয়ে যায়। আমরা একই ধরনের তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি, নতুন কিছু ভাবতে পারি না।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। যে দেশগুলো আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে, তারা সবাই বই পড়ার সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। তারা গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে, জ্ঞানচর্চাকে সম্মান দিয়েছে। আর এই সবকিছুর ভিত্তি হলো বই।

আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায়, আমরা ফলাফল চাই, কিন্তু প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিই না। আমরা চাই উন্নতি, কিন্তু সেই উন্নতির জন্য যে জ্ঞানচর্চা প্রয়োজন, তা আমরা এড়িয়ে যাই। ফলে আমাদের অগ্রগতি হয় পৃষ্ঠস্থ, স্থায়ী হয় না। একটি জাতির উন্নতি নির্ভর করে তার মানুষের চিন্তার মানের ওপর। যদি সেই চিন্তা সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে উন্নতিও সীমাবদ্ধ থাকবে। বই পড়া এই চিন্তাকে প্রসারিত করে, গভীরতা দেয়।

আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে—বই পড়া মানে সময়ের অপচয়। বিশেষ করে যারা প্রযুক্তি বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারা অনেক সময় মনে করেন বই পড়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা সত্যিকারের সফল, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত।

বই মানুষকে শুধু জ্ঞান দেয় না; এটি তাকে দৃষ্টিভঙ্গি দেয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এই গুণগুলো যেকোনো পেশার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকেও বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যায়। যদি একটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়, তাহলে তার মধ্যে পড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। কিন্তু যদি সে শুধু পরীক্ষার বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সে কখনোই পাঠের আনন্দ বুঝতে পারবে না।

বিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা যদি পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়ার প্রতি উৎসাহ দেয়, লাইব্রেরি ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ নয়, কিন্তু এটি অসম্ভবও নয়। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা এবং ইচ্ছাশক্তি। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও যদি কেউ বই পড়ে, তাহলে ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়।

আজকের ডিজিটাল যুগে বই পড়ার নতুন নতুন মাধ্যম তৈরি হয়েছে। ই-বুক, অডিওবুক—এসবের মাধ্যমে মানুষ সহজেই বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কিন্তু মূল বিষয় হলো—পড়ার ইচ্ছা। মাধ্যম যাই হোক, যদি ইচ্ছা থাকে, তাহলে বই পড়া সম্ভব। আমাদের জাতির উন্নতির জন্য বই পড়ার সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। কারণ একটি শিক্ষিত, সচেতন এবং চিন্তাশীল সমাজই পারে একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে তুলতে।

সবশেষে বলা যায়, বই থেকে দূরে থাকা মানে জ্ঞান থেকে দূরে থাকা, চিন্তা থেকে দূরে থাকা, উন্নতি থেকে দূরে থাকা। যদি আমরা সত্যিই একটি উন্নত জাতি হতে চাই, তাহলে আমাদের বইয়ের কাছে ফিরতে হবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি বইকে ভালোবাসে, সেই জাতিই জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিখরে পৌঁছায়।

 

লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা