কালের সাক্ষী হয়ে শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের বটবৃক্ষটি আজ হারাচ্ছে তার আগের জৌলুশ। এলাকার প্রবীণরা মনে করেন, গাছটির বয়স কয়েকশো বছর হলেও কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না এর প্রকৃত বয়স কত।
একসময় এই বটগাছকে কেন্দ্র করে পহেলা বৈশাখে বসত বিশাল বৈশাখী মেলা। স্থানীয় সনাতন ধর্মালম্বী জনগণ গাছটিকে দেবতা রূপে পূজা করতেন। এ গাছের ছায়াতলে গড়ে উঠেছিল ‘ঘনিয়ারপাড় বটছায়া সমাজসেবা ক্লাব’ নামের একটি সংগঠন, যা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
উপজেলা পরিষদ গঠনের পূর্বে গাছটির দু’পাশজুড়ে ছিল উন্মুক্ত খেলার মাঠ। পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই গাছের ডালে উঠে সময় কাটাতো, গল্প করতো। তখন এই গাছ ছিল এক প্রাণবন্ত মিলনস্থল।
কিন্তু আজ সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। উপজেলা কমপ্লেক্সের সীমানার ভেতরে পড়ে যাওয়ায় গাছটির চারপাশ এখন অনেকটাই নির্জন। নিরাপত্তা ও প্রবেশসংক্রান্ত বাধার কারণে মানুষ আর গাছটির ছায়ায় তেমন আসে না।
স্থানীয়রা মনে করেন, এই গাছটি শুধু একটি বৃক্ষ নয়, এটি এ এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতির ধারক। তাঁরা চান, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও বন বিভাগ গাছটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিক এবং পূর্বের মতো আবার যেন এই বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে আনা হয়।
স্থানীয় প্রবীণ তৈয়ব আলী বেপারী বলেন, আমার ছোটবেলা কেটেছে এই বটতলায়। পহেলা বৈশাখ এলেই চারপাশ গমগম করতো, মানুষের ঢল নামতো। এখন আর কেউ আসে না, গাছটা একা হয়ে গেছে।
ঘনিয়ারপাড় গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ক্লাব সদস্য তপন কুমার শীল জানান, বটছায়া সমাজসেবা ক্লাব গড়ে উঠেছিল এই গাছকে ঘিরেই। সামাজিক নানা কাজ হতো। এখন তো ক্লাবটাই নেই, গাছটাও অবহেলায় পড়ে আছে।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শ্যামল বাড়ৈ বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্ররা একসময় গাছে উঠে খেলতো, গল্প করতো। এখন তো গেটের ভেতরে পড়ে যাওয়ায় ছেলেমেয়েরা কাছে যেতেই পারে না।
প্রাক্তন শিক্ষার্থী শামীম খান বলেন, আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, প্রতিদিন টিফিনের সময় আমরা বটগাছটার নিচে বসে খাবার খেতাম। গাছের ডালে দোল খেয়ে সময় কাটানো ছিল আমাদের রোজকার আনন্দের অংশ। গরমের দিনে এই গাছের ছায়া ছিল স্বর্গের মতো। এখন সেই সময়গুলো শুধু স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
তরুণ সমাজকর্মী তানভীর আহমেদ বলেন, এই বটগাছ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। প্রশাসনের উচিত এটাকে সংরক্ষণ করা এবং এর আশেপাশে একটা খোলা সামাজিক চত্বর তৈরি করা।
স্থানীয় পূজারী বাসুদেব বলেন, এই বটগাছটা শুধু গাছ না, আমাদের বিশ্বাসের অংশ। বহু বছর ধরে আমরা এখানে পূজা করে এসেছি। এখন আর কেউ আসে না, গাছটা যেন নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে।
স্থানীয় গৃহবধূ বকলী রানী সেন বলেন, আমরা ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে এখানে আশীর্বাদ নিতে আসতাম। পূর্ণিমা কিংবা বিশেষ তিথিতে নারীরা গাছটিকে ফেরা দিয়ে প্রার্থনা করত। এখন তো সেই রীতি-নীতিই হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় হিন্দু যুবক হিরামন সেন বলেন, এই গাছের সঙ্গে আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি জড়িয়ে আছে। সরকার চাইলে এটা একটা ধর্মীয় ঐতিহ্য স্থান হিসেবেও সংরক্ষণ করতে পারে।
মতলব উত্তর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি এক বক্তব্যে বলেন,উপজেলা কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত শতবর্ষী এই বটবৃক্ষটি শুধু একটি গাছ নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। স্থানীয়দের আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে এই গাছটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছটির আশপাশের পরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গাছটির চারপাশে টাইলস বসিয়ে বটতলাকে পরিপাটি ও ছিমছাম করে তোলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমান প্রজন্মের জন্যও একটি প্রেরণার কেন্দ্র হোক। এ বটবৃক্ষকে ঘিরে ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ঐতিহ্যভিত্তিক কর্মসূচির আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।