অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, বিষ প্রয়োগে মৎস্য শিকার, প্লাস্টিক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায় বনের প্রাণীকূল ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহ দূষণের চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট নানা বিপর্যয়েরও শিকার। বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বনাঞ্চলে লবণাক্ততা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুসংস্থানের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য পশুর নদীসহ অভ্যন্তরীণ নদ-নদী ও খালগুলোকে দূষিত করছে। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার সমীক্ষায় নদীর পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। এতে জলজ প্রাণীর প্রজনন ও স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয় বনজীবী ও পরিবেশ গবেষকদের অভিযোগ, কিছু অসাধু চক্র নিয়মিত সুন্দরবনের খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং বিষাক্ত মাছ খেয়ে বন্যপ্রাণীসহ মানুষও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এছাড়া প্লাস্টিক দূষণ এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মোংলা, পশুর ও রূপসা নদীর মাছের মধ্যে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে সুন্দরবনে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বনজীবীদের অসতর্কতাকে কিছু ক্ষেত্রে দায়ী করা হলেও এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যে থাকা অন্য বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বনের অভ্যন্তরে নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ শিকার, বন্যপ্রাণী পাচার এবং কিছু অসাধু চক্রের কার্যক্রমের কারণে বাঘ, ইরাবতী ডলফিন ও শকুনসহ বহু বিপন্ন প্রজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে পরিবেশবিদরা দাবি করছেন।
অন্যদিকে, বন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সুন্দরবনের সুরক্ষায় ড্রোন নজরদারি, টহল বৃদ্ধি এবং অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিবেশবিদদের মতে, শুধুমাত্র নজরদারি যথেষ্ট নয়; শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মোংলা বন্দর ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চল যদি পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
তাদের মতে, সুন্দরবনের সংকট শুধু একটি বনাঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবেশগত অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ত পানির আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও মিঠা পানির উৎস ধ্বংস হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সুন্দরবন ভবিষ্যতে কেবল মানচিত্রের একটি নাম হয়ে দাঁড়াবে। তারা কঠোর আইন প্রয়োগ, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সংরক্ষিত এলাকায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
সর্বোপরি, সুন্দরবন রক্ষায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষক ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।