চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বাজারের পাশে, এমনকি সরকারি অফিসপ্রাঙ্গণেও এদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত দলবদ্ধ হয়ে তারা আড্ডা দেয়, বেপরোয়া আচরণ করে, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। দিনে রাতে দেশীয় অস্ত্রসহ সংঘবদ্ধ হয়ে নিয়মিত রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করে। মারামারি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত, মাদক সেবন, চাঁদা দাবিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত।
এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন এবং এলাকার বাসিন্দারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকাটি কিশোরদের অন্যতম আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাউন্ডারির ভিতরে কিছু কিশোর এসে আড্ডা দেয়। এতে রোগী ও তাদের স্বজনরা আতঙ্কিত হন। তাদের মাঝে অনেকেই ধূমপান করে, চিৎকার করে এবং হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করে।
শুধু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই নয়, এখলাসপুর, ফরাজীকান্দি, ছেংগারচর, গজরা, পাঁচআনী, পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের লুধুয়া রসুলপুর ব্রিজের উপর, চান্দ্রাকান্দি বেরিবাধ, মোহনপুর পর্যটন কেন্দ্র, সুগন্ধী, এখলাছপুর বেড়ীবাঁধ, আমুয়াকান্দি’সহ এলাকার স্কুল-কলেজ এবং বাজার ঘাটেও সন্ধ্যার পর কিশোরদের আড্ডা, উচ্চস্বরে গান বাজানো, মোটরসাইকেলে হর্ণ বাজিয়ে বেপরোয়া চলাফেরা, পথচারীদের উত্ত্যক্ত করার মতো কর্মকাণ্ড লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকে আবার মোবাইলে অশ্লীল কনটেন্ট দেখার মতো অপসংস্কৃতিতেও জড়িত।
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, তাদের সন্তানদের অনেকেই অজ্ঞাতসারে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে শিক্ষা ও নৈতিকতার দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা।
বাগানবাড়ী ইউনিয়নের কালির বাজারের নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য এসে টাকা দাবি করছেন। টাকা না দিতে চাওয়ায় হাতে থাকা হেলমেট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করে কিশোর গ্যাংয়ের ওই সদস্য। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল কিশোর গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা। আশপাশের অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান।
উপজেলার হরিনা এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, এলাকায় ইদানীং চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মোবাইল চুরি হচ্ছে বেশি। দিনের বেলায়ও বাসা-বাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। আমাদের প্রতি মুহূর্তে চোর ও কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্কে থাকতে হয়। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দ্রুত কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
অভিভাবক ছাড়াও শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবকরা বলছেন, কিশোর অপরাধ রোধে শুধু পুলিশি অভিযান নয়, প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। এছাড়া স্কুল-কলেজে নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ বাড়ানো দরকার।
মতলব উত্তরে কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ প্রশাসনের এমন সক্রিয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সচেতন মহল। তবে এ অভিযানের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক পরিকল্পনার দাবিও উঠেছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মতলব উত্তর থানা পুলিশ সম্প্রতি টানা দুই দিন অভিযান চালায়। অভিযানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ জন কিশোরকে আটক করা হয়।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রবিউল হক বলেন, আমরা বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পেয়ে অভিযান পরিচালনা করি। আটক কিশোরদের যাচাই-বাছাই শেষে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তীতে কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, এভাবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে দেওয়া যাবে না। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।