ইসলামের ইতিহাসে শিয়া–সুন্নি বিভাজন এমন একটি বিষয় যা বহু শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই বিভাজনের শিকড় মূলত নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সমাজে নেতৃত্ব বা খিলাফত প্রশ্নকে ঘিরে তৈরি হওয়া মতভেদের মধ্যে নিহিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মতভেদ বিভিন্ন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, ধর্মীয় অনুশীলন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে আরও বিস্তৃত ও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে ইসলামের ইতিহাসে শিয়া সম্প্রদায়ের ভেতরেও বিভিন্ন উপশাখার জন্ম হয়, যাদের বিশ্বাস ও মতাদর্শ একে অপরের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন।
আরবি ভাষায় “শিয়া” শব্দের অর্থ হলো “অনুসারী” বা “সমর্থকদের দল”। প্রাথমিক ইসলামী যুগে এটি মূলত সেইসব মুসলমানদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো যারা হযরত আলী (রা.)–কে মুসলিম সমাজের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মনে করতেন। পরবর্তীকালে এই রাজনৈতিক সমর্থন একটি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের রূপ নেয় এবং শিয়া ইসলামের বিভিন্ন ধারার বিকাশ ঘটে।
ইসলামের ইতিহাসবিদদের মতে, সপ্তম থেকে নবম শতকের মধ্যে শিয়া মতবাদের ভেতরে বিভিন্ন উপশাখা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কিছু গোষ্ঠী ছিল অপেক্ষাকৃত চরমপন্থী বা ব্যতিক্রমী মতাদর্শের অনুসারী। ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় যে সাবাইয়া, ঘুরাবিয়া এবং নুসাইরিয়া নামের কিছু গোষ্ঠী ইরাক, ইরান ও সিরিয়া অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিছু ধারণা ছিল মূলধারার ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন।
ইসলামী ইতিহাসবিদ Al-Tabari এবং অন্যান্য প্রাচীন সূত্রে উল্লেখ আছে যে প্রাথমিক যুগে কিছু গোষ্ঠী হযরত আলীর মর্যাদা নিয়ে অতিরঞ্জিত বা ব্যতিক্রমী ধারণা পোষণ করত। উদাহরণস্বরূপ, সাবাইয়া নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয় যে তারা আলীর প্রতি অতিরিক্ত ভক্তি প্রকাশ করত এবং কখনো কখনো তাকে আধ্যাত্মিক বা অতিমানবিক মর্যাদা দিত। তবে ইসলামের অধিকাংশ আলেম ও ঐতিহাসিক এই মতগুলোকে মূলধারার শিয়া বা সুন্নি বিশ্বাসের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি।
ঘুরাবিয়া নামে পরিচিত আরেকটি ঐতিহাসিক গোষ্ঠী সম্পর্কে কিছু মধ্যযুগীয় গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে যে তারা মনে করত ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) ওহি প্রদানের ক্ষেত্রে ভুল করেছিলেন। তবে অধিকাংশ ইসলামী গবেষক মনে করেন, এসব বর্ণনা অনেক সময় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও মতবাদের সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে অতিরঞ্জিত বা বিতর্কিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কারণ মূলধারার শিয়া ইসলামের প্রধান ধারা—ইমামিয়া ইসনা আশারিয়া—এ ধরনের বিশ্বাসকে কখনো গ্রহণ করেনি।
নুসাইরিয়া গোষ্ঠী, যাদের আধুনিক যুগে অনেক সময় আলাওয়ি নামে উল্লেখ করা হয়, সিরিয়া অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান ছিল। তাদের ধর্মীয় অনুশীলন ও বিশ্বাসের কিছু দিক ঐতিহ্যগত ইসলামের থেকে ভিন্ন হওয়ায় ইতিহাসে তারা একটি পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
শিয়া ইসলামের প্রধান ধারা হলো “ইমামিয়া ইসনা আশারিয়া” বা বারো ইমামের মতবাদ। এই ধারার অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে নবী মুহাম্মদ (সা.)–এর পর মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব হযরত আলী (রা.) এবং তার বংশধরদের মাধ্যমে অব্যাহত ছিল। এই ধারার মতে মোট বারো জন ইমাম ছিলেন, যাদেরকে তারা বিশেষ আধ্যাত্মিক মর্যাদাসম্পন্ন নেতা হিসেবে সম্মান করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ শিয়া মুসলমান, বিশেষ করে ইরান, ইরাক, আজারবাইজান এবং লেবাননে বসবাসকারী ইমামিয়া শিয়ারা, কোরআনের একই পাঠ গ্রহণ করে যা সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও প্রচলিত। অর্থাৎ তারা ১১৪টি সূরা বিশিষ্ট কোরআনকেই ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে মানে।
ইসলামের ইতিহাসে কখনো কখনো কিছু গ্রন্থ বা বর্ণনায় “সূরা আল-ওয়ালায়া” বা “সূরা আন-নূরাইন” নামের অতিরিক্ত সূরার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক ইসলামী গবেষণা এবং অধিকাংশ শিয়া ও সুন্নি আলেমের মতে এসব পাঠ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয় এবং মূল কোরআনের অংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআনের পাঠ সংরক্ষণ সম্পর্কে সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারারই প্রধান মত হলো—কোরআনের মূল পাঠ অপরিবর্তিত রয়েছে।
খলিফা হযরত উসমান (রা.)–এর সময় কোরআনের বিভিন্ন পাঠ একত্রিত করে একটি মানক পাঠ রূপে সংকলন করা হয়। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী এই কাজের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত পাঠভেদ দূর করা এবং কোরআনের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিহাসে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও অধিকাংশ মুসলিম আলেমই একমত যে বর্তমান কোরআনই নবী মুহাম্মদ (সা.)–এর ওপর অবতীর্ণ কোরআনের মূল পাঠ।
শিয়া–সুন্নি মতপার্থক্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামের প্রাথমিক খিলাফত প্রশ্ন। সুন্নি মুসলমানরা চারজন খলিফাকে—আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.)—“খুলাফায়ে রাশেদিন” হিসেবে সম্মান করেন। অন্যদিকে অনেক শিয়া ঐতিহাসিকভাবে মনে করেন যে আলী (রা.)–ই নবীর প্রকৃত উত্তরসূরি ছিলেন। এই মতভেদের কারণেই ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে।
নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–এর পরিবার বা আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারাই আহলে বাইতকে সম্মান করে। তবে এই সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতি ও ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। শিয়া ইসলামে ইমামদের আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সুন্নি ইসলামে নেতৃত্বের ধারণা মূলত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বিশেষ করে কারবালার ঘটনা, শিয়া–সুন্নি সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। হযরত হুসাইন (রা.)–এর শাহাদাত শিয়া ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, যা তাদের ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে। সমসাময়িক বিশ্বে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা বহু দেশে একসঙ্গে বসবাস করে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অনেক সময় এই মতভেদকে উস্কে দেওয়া হয়। কিন্তু ইসলামের বহু আলেমই মনে করেন যে মুসলমানদের ঐক্য বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সম্মান রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার সময় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল। ফলে কোনো কোনো বর্ণনা পক্ষপাতদুষ্ট বা বিতর্কিত হতে পারে। তাই আধুনিক গবেষণায় ঐতিহাসিক দলিল, ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন উৎসের তুলনামূলক অধ্যয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিশেষে বলা যায়, শিয়া–সুন্নি মতপার্থক্য ইসলামের ইতিহাসের একটি জটিল অধ্যায়। এতে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির গভীর প্রভাব রয়েছে। এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় আবেগের পরিবর্তে জ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন। কারণ ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ন্যায়, সত্য এবং মানবিকতার পথে চলা।
তথ্যসূত্র
1. Tarikh al-Tabari
2. Sirat Rasul Allah
3. Al-Sirah al-Nabawiyyah
4. The Succession to Muhammad
5. ইসলামী ইতিহাস ও শিয়া–সুন্নি মতপার্থক্য বিষয়ক আধুনিক গবেষণা গ্রন্থ।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।
#ইসলাম #মুসলমান #শিয়া #সুন্নি #সবাই