June 24, 2026, 7:55 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

দারিদ্র্য দূরের একমাত্র পথ : ইসলামী বিধান মেনে সুদ প্রথা বিলুপ্ত ও যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর

Reporter Name

মানবসভ্যতার ইতিহাসে দারিদ্র্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সমস্যা। যুগে যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্র, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক এবং সমাজ সংস্কারক দারিদ্র্য দূর করার জন্য নানা তত্ত্ব ও ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছেন। কোথাও পুঁজিবাদ, কোথাও সমাজতন্ত্র, কোথাও কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা, আবার কোথাও মুক্তবাজার অর্থনীতি দারিদ্র্য বিমোচনের সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক পৃথিবী প্রযুক্তি, শিল্প, বিজ্ঞান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করলেও দারিদ্র্য এখনো নির্মূল হয়নি। বরং পৃথিবীর একদিকে যখন সীমাহীন সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ এখনো ক্ষুধা, বেকারত্ব, ঋণের বোঝা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার।

পবিত্র আল কোরআন মানবজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মতো অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সম্পর্কেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। ইসলাম দারিদ্র্যকে শুধু অর্থের অভাব হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা, সম্পদের অন্যায্য বণ্টন এবং মানবিক দায়িত্ববোধের সংকট হিসেবেও বিবেচনা করে। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুটি মৌলিক স্তম্ভ হলো সুদমুক্ত অর্থনীতি এবং যাকাতভিত্তিক সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা। কোরআনের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, সুদ মানুষের সম্পদকে কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত করে এবং যাকাত সেই সম্পদকে সমাজের নিম্নস্তরে প্রবাহিত করে। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে।

আজকের বিশ্বে দারিদ্র্যের অন্যতম বড় কারণ হলো সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ঋণনীতি পর্যন্ত সর্বত্র সুদের প্রভাব বিস্তৃত। একজন দরিদ্র মানুষ যখন প্রয়োজনের তাগিদে ঋণ নেয়, তখন সে মূল অর্থের পাশাপাশি সুদের বোঝাও বহন করতে বাধ্য হয়। ফলে সে আরও বেশি অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। অন্যদিকে যাদের হাতে মূলধন রয়েছে, তারা সুদের মাধ্যমে কোনো উৎপাদনশীল ঝুঁকি ছাড়াই সম্পদ বৃদ্ধি করে। এভাবেই ধনী আরও ধনী হয় এবং দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়ে পড়ে। পবিত্র কোরআন সুদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছে। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারায় বলেন: “যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন এমনভাবে উঠবে, যেমন শয়তান স্পর্শ করে কাউকে পাগল করে দেয়।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

এই আয়াত শুধু আখিরাতের শাস্তির কথা বলে না; বরং সুদের সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিও ইঙ্গিত করে। সুদ মানুষের মধ্যে সহযোগিতার পরিবর্তে শোষণের সংস্কৃতি তৈরি করে। এটি অর্থনীতিকে উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন করে অর্থের ওপর অর্থ উপার্জনের প্রবণতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: “আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৬)

এই আয়াত ইসলামী অর্থনীতির মূল দর্শনকে স্পষ্ট করে। মানুষের দৃষ্টিতে সুদ লাভজনক মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে তা বরকতহীন। বিপরীতে দান, সদকা এবং যাকাত মানুষের সম্পদকে কমিয়ে দেয় বলে মনে হলেও বাস্তবে তা সমাজে কল্যাণ, স্থিতিশীলতা এবং বরকত সৃষ্টি করে।

ইসলামে সম্পদের মালিকানা স্বীকৃত হলেও সম্পদের ওপর সমাজের অধিকারও স্বীকৃত। একজন ব্যক্তি তার উপার্জিত সম্পদের মালিক হতে পারে, কিন্তু সে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। তার সম্পদের মধ্যে গরিব, অসহায়, এতিম, মিসকিন এবং বঞ্চিত মানুষেরও অধিকার রয়েছে। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই যাকাতকে ফরজ করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে বহুবার সালাত এবং যাকাতকে একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং সামাজিক ন্যায়বিচারেরও ধর্ম। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।” (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)

যাকাতের মাধ্যমে সমাজের সম্পদ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে জমা হয়ে থাকে না। প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবাহিত হয়। এর ফলে সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসে।

আধুনিক অর্থনীতিতে বৈষম্য একটি বড় সমস্যা। পৃথিবীর অল্প কিছু মানুষ বিশ্বের অধিকাংশ সম্পদের মালিক। অন্যদিকে বিপুল জনগোষ্ঠী মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ। ইসলাম এই বৈষম্য দূর করার জন্য যাকাতকে বাধ্যতামূলক করেছে।

যাকাত কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দানশীলতার প্রদর্শনীও নয়। এটি দরিদ্র মানুষের অধিকার। একজন মুসলমান যখন যাকাত দেয়, তখন সে কাউকে অনুগ্রহ করে না; বরং আল্লাহর নির্ধারিত একটি অধিকার ফিরিয়ে দেয়।

সূরা আত-তাওবায় আল্লাহ তাআলা যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত আটটি শ্রেণির কথা উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম কত সুসংগঠিতভাবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যদি একটি রাষ্ট্রে প্রকৃত অর্থে যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তাহলে অসংখ্য দরিদ্র পরিবার স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য এবং বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে সমাজে অপরাধও কমে যাবে। কারণ অর্থনৈতিক হতাশা অনেক সময় মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

ইসলামী অর্থনীতির সৌন্দর্য হলো এটি একদিকে সুদকে নিষিদ্ধ করে শোষণের পথ বন্ধ করে, অন্যদিকে যাকাতকে বাধ্যতামূলক করে সম্পদের প্রবাহ নিশ্চিত করে। অর্থাৎ ইসলাম শুধু “না” বলে থেমে যায় না; বরং বিকল্প ব্যবস্থাও প্রদান করে।

আজ বিশ্বের বহু দেশ অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। আন্তর্জাতিক ঋণ, সুদের বোঝা এবং বৈদেশিক নির্ভরতা অনেক রাষ্ট্রকে কার্যত অর্থনৈতিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কোরআনের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, সুদভিত্তিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে স্থিতিশীল করতে পারে না। কারণ এটি উৎপাদনের পরিবর্তে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করে। এটি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে এবং অর্থনীতিকে মানবিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।

সুতরাং দারিদ্র্য দূর করার প্রকৃত সমাধান কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টন। আর সেই ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল উপস্থাপন করেছে ইসলাম। সুদ প্রথা বিলুপ্ত করা এবং যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর করা শুধু ধর্মীয় নির্দেশই নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কার্যকর উপায়।

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা