এক আত্মজিজ্ঞাসা
১৯৭১ সালের এক রক্তাক্ত ভোরে, বাঙালি জাতি মুক্তির স্বপ্নে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। পেছনে পড়ে ছিল দুই শতাব্দীর শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এসেও প্রশ্ন জাগে—এই পথচলার শেষে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? কেন এখনো উন্নত দেশের মর্যাদায় পৌঁছাতে পারিনি?
তারা পারলে, আমরা কেন নয়?
একই সময়ে স্বাধীনতা পাওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯৭১) কিংবা সিঙ্গাপুর (১৯৬৫)—এই দুটি দেশ আজ উন্নয়নের বিশ্বরোল মডেল। আমিরাত তাদের তেলসম্পদকে দূরদর্শী পরিকল্পনায় কাজে লাগিয়েছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। সিঙ্গাপুর একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র হয়েও মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কঠোর আইনের মাধ্যমে নজিরবিহীন উন্নয়ন ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ—যেখানে স্বাধীনতার পরপরই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো ঘটনা ঘটেছে। বহু রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীর কানাডার ‘বেগম পাড়া’, মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’, দুবাই ও লন্ডনে ভিলা—এসবই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতির সাক্ষ্য বহন করে।
দুর্নীতির অদৃশ্য দৈত্য!
বাংলাদেশের ঘাড়ে যেন চেপে বসেছে এক অদৃশ্য দৈত্য—দুর্নীতি। এই দৈত্য কখনো ঘুষের রূপে, কখনো দলীয় প্রভাব-প্রত্যক্ষানে, আবার কখনো প্রভাবশালী চক্রের ছায়া হয়ে সরকারি অফিস-আদালতকে গ্রাস করেছে। দক্ষতা নয়, পরিচয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাপ্তির মাপকাঠি।
স্কুল-কলেজ, ভূমি অফিস, হাসপাতাল, পুলিশ প্রশাসন—প্রায় সর্বত্রই অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট। এই অনিয়ম জাতির ভিতরে পচন ধরিয়েছে, দুর্বল করেছে মূল্যবোধ।
দৃশ্যমান উন্নয়ন বনাম বৈষম্যের বাস্তবতা!
আমরা গর্ব করি—পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: এই উন্নয়ন কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জীবনে স্পর্শ ফেলেছে? উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু তার সুফল কাদের জন্য? গ্রামীণ মানুষ এখনো চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, বন্যার পানিতে ভেসে যায়,একজন মেধাবী ছাত্র পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পিছিয়ে পড়ে।
অথচ উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতি—যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়।
প্রতিহিংসার রাজনীতির বিষবাষ্প!
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যেন এক বিষণ্ন চিত্রপট—ক্ষমতা মানেই বিরোধীকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস, বাকস্বাধীনতার কণ্ঠরোধ, ও প্রশাসনের দলীয়করণ।
এই প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি কেবল অগ্রগতিকে রুদ্ধ করেনি, বরং জাতিকে বিভক্ত করেছে অবিশ্বাস আর ঘৃণার প্রাচীরে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি মতে, নেতৃত্ব একটি আমানত—ক্ষমতা মানে খেদমত, প্রাধান্য নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনার রাষ্ট্রে ইনসাফ কায়েম করেছিলেন, প্রতিশোধ নয়। বর্তমান রাজনীতিকে এই নীতিবোধে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
আশার আলো ও দিকনির্দেশনা!
তবুও হাল ছাড়ার সময় নয়। বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় জাতি—আমাদের আছে প্রাণশক্তি, মেধাবী জনশক্তি, উদ্যোক্তা শ্রেণি, ও বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
প্রয়োজন শুধু একটি স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, এবং নৈতিক শিক্ষায় গড়া প্রজন্ম। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রতি বিনিয়োগই পারে আমাদের পথ বদলে দিতে।
উপসংহার : স্বাধীনতা মানে কেবল ভূখণ্ড নয়!
আমরা আজও একাত্তরের আত্মত্যাগকে স্মৃতিতে রেখেছি, কিন্তু চরিত্রে ধারণ করিনি। উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন মূল্যবোধের উন্নয়ন, নেতৃত্বে নৈতিকতা, ও সুশাসনের বাস্তব প্রয়োগ।
স্বাধীনতা মানে কেবল ভূখণ্ডের মালিকানা নয়—স্বাধীনতা মানে স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ এবং সামষ্টিক বিবেক। যতদিন না এই উপলব্ধি জাতির রন্ধ্রে প্রবাহিত হবে, ততদিন উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে—বাস্তবতা নয়।
লেখক :
মোঃ সিফাত
ইমেইল: zarifahmadsifat@gmail.com