”শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর”-এই মহান বাণীটি এক সময় মানুষ চিরন্তন ও অম্লান হিসাবে মেনে চলতো। কিন্তু না, আমি আজ বলবো-আদর্শ শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় মহান শিক্ষকদের অবদানসমূহ। যাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে মানবীয় গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ, যারা ব্যক্তি থেকে বিশ্ব সকল ক্ষেত্রে স্ব-স্ব কর্ম গুণ সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। অথচ আজকাল সেই মহান পেশা শিক্ষকতার শিক্ষকদের আচরণ দেখলে মনে হয় তারা সেই বাণীকে মিথ্যা প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষকরা যেন এই মানুষ গড়ার পরিবর্তে ব্যবহাস হিসাবে নিয়েছে এই মহান ব্রতকে।
শিক্ষক হলেন যাঁরা শিক্ষাদানের মহান ব্রত পালন করেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিতদেরই শিক্ষক বলা হয়। শিক্ষকদের জাতি গঠনের কারিগরও বলা হয়। কেননা একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায় দীক্ষা দিতে। শিক্ষার্থীর মানবতাবোধ কে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান কে সার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরাণ্বিত করেন। স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে তাদেরকে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন।
একজন আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব!
একজন শিক্ষকের ভূমিকা সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। শিক্ষকরা সাক্ষরতা এবং সংখ্যা, কারুশিল্প বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কলা, ধর্ম, নাগরিক বিজ্ঞান, সম্প্রদায়ের ভূমিকা বা জীবন দক্ষতার নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্মত পাঠ্যক্রম অনুসারে পাঠ প্রস্তুত করা, পাঠ প্রদান করা এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা। একজন শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও প্রসারিত হতে পারে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকরা মাঠ ভ্রমণে শিক্ষার্থীদের সাথে যেতে পারেন, স্টাডি হলের তত্ত্বাবধান করতে পারেন, স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করতে পারেন এবং পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কার্যকলাপের জন্য সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতে পারেন। ছাত্রদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার আইনগত দায়িত্বও রয়েছে। যেমন যেগুলি হয়রানি, যৌন হয়রানি, বর্ণবাদ বা অপব্যবহারের ফলে হতে পারে। কিছু শিক্ষাব্যবস্থায়, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার জন্য দায়ী হতে পারে।
আদর্শ শিক্ষকের গুনাবলী!
শিক্ষণ একটি অত্যন্ত জটিল কার্যকলাপ। এটি আংশিকভাবে কারণ শিক্ষা একটি সামাজিক অনুশীলন, যা একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে (সময়, স্থান, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি) সঞ্চালিত হয় এবং সেই কারণে সেই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত হয়। শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত (বা প্রয়োজনীয়) যা প্রভাবিত করে তার মধ্যে রয়েছে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য, শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শেখার বিষয়ে গৃহীত তত্ত্ব ইত্যাদি। একজন আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলী অনেক, যা শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আদর্শ শিক্ষকের কিছু মূল গুণাবলী হলো:
১. জ্ঞান ও দক্ষতা : শিক্ষককে নিজ বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং দক্ষতা থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তার কাছ থেকে সঠিকভাবে শিখতে পারে।
২. সহনশীলতা ও ধৈর্য : প্রতিটি শিক্ষার্থী একভাবে শিখে না। তাই শিক্ষকের সহনশীল এবং ধৈর্যশীল হওয়া জরুরি, যাতে তারা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজ নিজ গতিতে শেখার সুযোগ দেন।
৩. যোগাযোগ দক্ষতা : শিক্ষককে স্পষ্ট এবং সহজভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। শিক্ষার বিষয়গুলো সহজে বোঝানো এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ দূর করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৪. প্রেরণা দানকারী : একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেন, তাদের উৎসাহিত করেন নতুন জিনিস শিখতে এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে। উদ্দীপনা সঞ্চারকারী ও সুশিক্ষক শিক্ষার্থীর হৃদয়ে শিক্ষার্জনের অনুকূল প্রেরণা ও উদ্দীপনার কলাকৌশল প্রয়োগে সুনিপুণ হবেন। নিরানন্দ শিক্ষাদান ও কৃত্রিম নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী। কাজেই শিক্ষককে এমন সব কৌশলের চর্চা করতে হবে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাঠে মনযোগী হবে।
৫. ন্যায়পরায়ণতা : শিক্ষার্থীদের প্রতি সমানভাবে আচরণ করা এবং কোনও প্রকার বৈষম্য না করা শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।
৬. পরিকল্পনা ও সংগঠন : শিক্ষার পদ্ধতি এবং ক্লাসের সময় সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়াকে কার্যকর করে তোলে।
৭. নেতৃত্বদান : একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হন এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে সাহায্য করেন। সুশিক্ষক অবশ্যই তার আচার আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আস্থা, শ্রদ্ধা এবং সহৃদয় সহযোগিতা লাভ করতে প্রয়াসী হবেন। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার লক্ষ্যপথে চালাতে তথা তাদের আচার আচরণে বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধনে শিক্ষক নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারেন।
৮. সহানুভূতি : শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ও সমস্যার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের প্রতি যত্নবান হওয়া শিক্ষকের বিশেষ গুণ।
৯. শৃঙ্খলা বজায় রাখা : শিক্ষককে শ্রেণীকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হতে হবে, তবে তা শিক্ষার্থীদের প্রতি কঠোর না হয়ে সহানুভূতিশীল পদ্ধতিতে হওয়া উচিত।
১০. সুমধুর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন : সার্থক শিক্ষক সৌম্য মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবেন। প্রথম দর্শনেই শিক্ষকের যে বৈশিষ্ট্যটি শিক্ষার্থীর মন কাড়ে, তা হলো তার শান্ত মধুর প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব। শিক্ষকের সুমধুর ব্যক্তিত্ব প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে তার প্রতি স্বাভাবিক প্রীতি ও শ্রদ্ধার ভাব জাগিয়ে তােলে।
১১. সুস্বাস্থ্য : শিক্ষক হবেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। কর্মোদ্যম ও প্রাণময়তা, শান্ত মেজাজ ও পরিমিতিবোধ শিক্ষকতা পেশার জন্য অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। সুস্বাস্থ্য ছাড়া এ গুণগুলির অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়।
১২. নবীন মানস : শিক্ষকের স্বাভাবিক সহজতাই তাকে রাখে কর্মময়, চির নবীন ও প্রাণবন্ত। নবীন মনই তাকে শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। অনুরাগের প্রতিফলনে তিনি শিক্ষার্থীদের আপনজন হওয়ার যোগ্যতা, অধিকার ও গৌরব লাভ করেন।
১৩. শিশুরঞ্জন মানসিকতাসম্পন্ন : স্বার্থক শিক্ষক হবেন শিশুরঞ্জন মনের অধিকারী শিশুকে ভাল না বাসলে তিনি শিশুর সজীব মনের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, স্বপ্ন-সাধ, আশা আকাক্ষা, আনন্দ বেদনা, অনুরাগ অভিমান সম্পর্কে জানতে পারবেন না । রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “কী শিখাব, তা ভাববার কথা বটে; কিন্তু যাকে শিখাব তার সমস্ত মনটা কী করে পাওয়া যেতে পারে, সেটাও কম কথা নহে।”
শিক্ষকের সুমধুর মনোভঙ্গি, সহজ প্রসন্নতা, সাহায্যদানের সদিচ্ছা অতি সহজেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে ঘিরে প্রীতিময় পরিমণ্ডল রচনা করে এবং এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্জন অনায়াস, আনন্দময় এবং অর্থবহ হয়ে ওঠে।
১৪. মৌলিকতা : মৌলিকতা সুশিক্ষকের একটি মূল্যবান সম্পদ। তার পরিচয়ের স্বাক্ষর বহন করে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষামূলক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে মৌলিক গুণসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা এবং তার গুণের প্রয়োগ অপরিহার্য।
১৫. নমনীয়তা : চিত্তের প্রসার ও নমনীয়তা শিক্ষককে বিচিত্র ধরনের মানুষের মধ্যেও বিবিধ পরিবেশে সামঞ্জস্য বিধানের দক্ষতা দান করে। এর উৎস হচ্ছে অহং শূন্যতা। মানিয়ে চলবার ক্ষমতার সঙ্গে অন্তরে যে সহানুভূতি, সহৃদয়তা এবং নমনীয়তার স্পর্শ থাকে, তার মূলে থাকে অহংশূন্যতার অকপট গুণটি। সহ্যশক্তি, ক্ষমাগুণ এবং সহজাত প্রসন্নতা ব্যতীত গ্রহণশীলতার দুর্লভ ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এই ক্ষমতা শিক্ষককে একাধারে বিচিত্র এবং বিরূদ্ধ প্রকৃতির শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়ে একই সাথে একই লক্ষ্যে চলবার সামর্থ্য যোগায়।
১৬. চাহনী ও বাকশৈলী : সুশিক্ষকের শিক্ষণকর্মের দুটি চমৎকার কলাকৌশল হলো চাহনী ও বাকশৈলী। একটি অস্ফুট অপরটি ফুট। চোখের চাহনী অস্ফুট হলেও ক্ষেত্র বিশেষে এটি বাকভঙ্গিকেও গৌণ করে দিতে পারে। বিস্ময়কর শব্দ চেতনা, প্রচুর শব্দ ভাণ্ডার বাক চাতুর্য এবং শব্দ ও বাক্য প্রয়োগে প্রয়োজনানুগ সংকোচন প্রসারণ, উচ্চ- নিচ স্বর ও সংযম শিক্ষকের প্রকাশ ভঙ্গিকে সংবেদনশীল, মনোজ্ঞ ও অর্থবহ করে তোলে।
১৭. রসিকতা বোধ : সুশিক্ষক অবশ্যই হবেন সুরসিক। তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ বিতরণ করবেন, তাদের আনন্দের অংশীদার হবেন কিন্তু আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ক্রমশ তামাশার কারণ হবেন না। পাঠদানে সময়োচিত রস কৌতুকের স্নিগ্ধ আমেজ ও মধুর সম্পর্ক অনুভূত হলে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ গ্রহণ হবে স্বচ্ছন্দ।
১৮. দৃঢ় মানসিকতা : প্রত্যয় দৃঢ় মানসিকতা উত্তম শিক্ষকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিটি কথায় ও কাজে, পোশাক ও রুচিতে, পেশায় ও কর্তব্য পালনে তিনি আদর্শবান, ধর্মপ্রাণ, সত্যপ্রিয় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেবেন। কেবলমাত্র আদেশ উপদেশ নয়, শিক্ষক নিজের অভ্যাস, অনুশীলন এবং জ্ঞান অভিজ্ঞতায় লব্ধ বিচিত্র কর্মের মাধ্যমে ছাত্রদের চরিত্রে বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধনে উদ্যোগী হবেন।
১৯. উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা : শিক্ষকের অতি বড় হাতিয়ার হলো প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বা উপস্থিত বুদ্ধি। বিদ্যালয়ের যে কোন আকস্মিক সমস্যার তাৎক্ষণিক মোকাবেলার জন্য অতি দ্রুত একটি বৌদ্ধিক ও যৌক্তিক সমাধানে পৌছাতে হয়। পরিবেশ পরিস্থিতির সংগে খাপ খাইয়ে যতদূর সম্ভব সৃষ্ট কোন সমস্যার দ্রুত সুরাহার উপযোগী একমাত্র বর্ম উপস্থিত বুদ্ধি।
২০. মার্জিত পোশাক : আদর্শবান শিক্ষকের ব্যক্তিত্বের ভূষণ হলো সুমার্জিত আচার আচরণ এবং পরিপাটি পোশাক। আড়ম্বরের বাহুল্য আসল মানুষের ব্যক্তিত্বকে কৃত্রিম আবরণে ঢেকে রাখে। শিক্ষকের কাজ সহজকে নিয়ে সহজ হওয়ায়। তার জীবনাদর্শ সহজ জীবন ও মহৎ ভাবনা হওয়াই কাম্য।
২১. উদ্যমশীলতা : শিক্ষক আত্মপ্রত্যয়শীল ও সক্রিয় হবেন। নিরুদ্যম, নিঃস্পৃহ শিক্ষক কখনও সফল হতে পারেন না।
২২. সামাজিকতাবোধ: শিক্ষককে শ্রেণী শিক্ষাদানে বা শ্রেণীর বাইরে সমাজের একটি ক্ষুদ্রাংশ নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। এদের প্রতি দায়িত্ব পালনে শিক্ষককে শিক্ষার আদর্শ সমাজের আদর্শ, শিক্ষার্থী ও সমাজের চাহিদা ইত্যাদি বিচার বিবেচনা করে তার নিজ কর্তব্য সম্পন্ন করতে হয়। তাই তাকে সমাজ সেবার মনোভাব নিয়ে সমাজের চাহিদা পরিপূরণের বিশেষ ভূমিকা পালন করার উপযোগী হতে হবে।
২৩. মুদ্রাদোষমুক্ত : শিক্ষককে সকল মুদ্রাদোষ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। শৈশব, বাল্য ও কৈশোরকাল হলো অনুকরণ ও অনুশীলনের সময়। শিক্ষকের মুদ্রাদোষ স্বভাবতই শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষকের মুদ্রাদোষ থাকা অনুচিত।
২৪. অধ্যয়নশীল : একজন সুশিক্ষকের সাধনাই হচ্ছে সারাজীবন ছাত্র থাকার মানসিকতা পোষণ করা। শিক্ষার্জনের পথ কেবল ডিগ্রিপ্রাপ্তি বা পুঁথি সর্বস্ব জ্ঞানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। এই পরিবর্তনের সংগে মনমানসিকতাকে সজীব রাখার জন্য শিক্ষা ক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান শিক্ষককে অধ্যয়নের মাধ্যমে সজীব ভাবনা ও নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হতে হবে।
২৫. শিখন পদ্ধতি সংক্রান্ত জ্ঞান : শিক্ষক কেবল জ্ঞান সমৃদ্ধই হবেন না, শিক্ষার্থীর মনে জ্ঞান প্রয়োগের মূল সূত্রটি তিনিই ধরিয়ে দেবেন। এজন্যই শিক্ষণীয় বিষয়ের জ্ঞান, বিষয়সম্পৃক্ত অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান এবং শিক্ষাবিজ্ঞান সম্পর্কে তার ধ্যান ধারণা থাকতে হবে। শিক্ষককে আধুনিকতম শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং বাস্তব ক্ষেত্রে জ্ঞান প্রয়োগের প্রয়োগ কৌশল বিশেষভাবে আয়ত্ত করতে হবে।
২৬. আত্মমূল্যায়ন : অবিরত আত্মসমীক্ষা ও আত্মমূল্যায়ন করা নিজ পেশায় নিষ্ঠ শিক্ষকের রক্ষাকবচ। মানুষ দোষমুক্ত নয়, সমালোচনা বহির্ভূত নয়। আত্ম সমালোচনা নিজের চিন্তা ও কর্মের পথকে পরিশীলিত করে আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে সাহায্য করে।
শিক্ষক হিসেবে সফল তথা শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষককে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।
শিক্ষকের মনস্তত্ত্ব!
শিক্ষককে জীবন্ত উপাদান নিয়ে কাজ করতে হয় বলে শিক্ষকতা একটি উচু দরের শিল্প। শিক্ষক শুধু খবরের উৎস বা ভাণ্ডার নন, কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহকারী নন। শিক্ষক শিশুর বন্ধু, পরিচালক ও যোগ্য উপদেষ্টা। শিক্ষার সর্বস্তরে শিক্ষকই হলেন শিক্ষাকর্মের মূল উৎস।একজন আদর্শ শিক্ষকের পক্ষেই সম্ভব শিক্ষার কাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা । তাই বলা যায়, একজন উত্তম শিক্ষক হবেন উত্তম ছাত্র। শিক্ষকের ছাত্রত্ব গ্রহণে তার মনের তারুণ্য নষ্ট হতে পারে না, বরং তিনি সব সময়ই ছাত্রদের সুবিধা অসুবিধা ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন এবং এ কারণেই তিনি শিশুদের মনের একান্ত কাছাকাছি থাকবেন। আরো বলা যেতে পারে, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ জীবনব্যাপী শিক্ষার ভার নেবেন। তাই শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর বন্ধু, নির্দেশক, জীবনাদর্শের বাস্তব প্রতীক।
পেশাগত কিছু সমস্যাসমূহ!
শিক্ষকরা তাদের কাজের জন্য বিভিন্ন পেশাগত বিপদের সম্মুখীন হন, যার মধ্যে রয়েছে পেশাগত চাপ, যা নেতিবাচকভাবে শিক্ষকদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সাংগঠনিক পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্ক, সহকর্মী শিক্ষক এবং প্রশাসনিক কর্মীদের আচরণ, কাজের পরিবেশ, প্রতিস্থাপনের প্রত্যাশা,দীর্ঘ সময় ধরে ভারী কাজের কারণে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও শিক্ষকরা পেশাগত বার্নআউটের জন্য উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০০০ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যুক্তরাজ্যে ৪২% শিক্ষক পেশাগত চাপের সম্মুখীন হয়েছেন, যা গড় পেশার তুলনায় দ্বিগুণ। ২০১২ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে শিক্ষকরা অন্যান্য গড় কর্মীদের তুলনায় উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক চাপ দ্বিগুণ হারে অনুভব করেন। শিক্ষাদানের পেশাগত সমস্যা প্রশমিত করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। সাংগঠনিক হস্তক্ষেপ, যেমন শিক্ষকদের সময়সূচী পরিবর্তন, সহায়তা এবং পরামর্শ প্রদান, কাজের পরিবেশ পরিবর্তন, পদোন্নতি এবং বোনাস প্রদান শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত চাপ কমাতে সাহায্য করতে কার্যকর হতে পারে। চাপ-ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সেলিং সহ ব্যক্তিগত-স্তরের হস্তক্ষেপসমূহ শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত চাপ দূর করতে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমান শিক্ষাদান পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকার ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একদিকে শিক্ষাদান কাজ যেমন জটিল অন্যদিকে এটি একটি মহান পেশাও বটে। এই মহান ও জটিল কাজটিকে পেশা হিসাবে নিতে হলে শিক্ষকের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের সমাহার থাকা দরকার, যা তাকে তার দায়িত্ব কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করতে সহায়তা করবে।
উক্ত গুণগুলি শিক্ষক তার সহজাত এবং অর্জিত জ্ঞান অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে আয়ত্ত করবেন। নিজ পেশায় অনুরাগ ও অধিকারে ব্রতী শিক্ষক অনেক গুণই অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেন। এছাড়াও নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলি অর্জনে তার ধী, মেধা, প্রবণতা এবং নৈপুণ্যের প্রয়োগ করবেন।
শেষকথা :
একজন আদর্শ শিক্ষকের ভেতরে যেসমস্ত বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার আমি আশা করি উপরের আলোচনায় কিংচিৎ হলেও আপনাদের ধারণা দিতে পেরেছি। আমি এখানে চেষ্টা করেছি যে একজন আদর্শ শিক্ষকের কি কি বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার সেই সম্পর্কে যৎসামান্য ধারণা দেওয়ার। প্রত্যাশা থাকবে আমাদের সম্মানীত শিক্ষক সমাজ এই সকল গুণাবলীসমূহ সাধনার মাধ্যমে তার সকল ছাত্রদের যোগ্য মানুষ হিসাবে গড়ে তুলে নিজেকে একজন আদর্শবান মানুষ গড়ার কারিগর হিসাবে উপস্থাপনে সচেষ্ট থাকবেন। সেই সাথে তারা নিজেকে শিক্ষকতা নামক মহান পেশার যোগ্য মানুষ হিসাবে ব্যক্তি, সমাজ রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিমণ্ডলের সেবায় নিয়োজিত করে যাবেন।
লেখক :
আজম পাটোয়ারি
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।