যে কোনো রাষ্ট্রে গণআন্দোলন একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কখনও তা গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি থেকে জন্ম নেয়, কখনও তা নীতিগত বিরোধিতা থেকে, আবার কখনও রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে বিস্তার লাভ করে। কিন্তু যখন কোনো আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়, প্রাণহানি ঘটে, পুলিশসহ বিভিন্ন পক্ষের সদস্য নিহত হন, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর হয়—তখন প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক থাকে না; সেটি আইনি, নৈতিক এবং রাষ্ট্রদর্শনের প্রশ্নে পরিণত হয়।
ধরা যাক, সরকারবিরোধী জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের “সকল বিষয়ে দায়মুক্তি” প্রদান করেছে—এমন একটি সিদ্ধান্ত যদি নেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংবিধান, ফৌজদারি আইন, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক শাসনের আলোকে গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ দায়মুক্তি কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; এটি বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বোধের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, দায়মুক্তি বলতে আমরা কী বুঝি? সাধারণভাবে দায়মুক্তি (amnesty বা indemnity) হলো এমন একটি আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংঘটিত কিছু অপরাধ বা কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, বিচার বা শাস্তি প্রযোজ্য হবে না। ইতিহাসে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন, গৃহযুদ্ধ বা স্বৈরশাসন-পরবর্তী রূপান্তরকালে এমন আইন দেখা গেছে। কিন্তু সব দায়মুক্তি সমান নয়। কিছু দায়মুক্তি সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ, আবার কিছু ব্যাপক ও নিঃশর্ত।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—যদি হত্যাকাণ্ড, গুরুতর সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ধ্বংসের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে সেগুলোর জন্য দায়মুক্তি দেওয়া কি ন্যায়সংগত? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রাণহানির ক্ষেত্রে দায়মুক্তি প্রদান ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। কারণ এতে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
পুলিশ সদস্যরা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশ। আন্দোলনের সময় যদি তাঁদের কেউ নিহত হন, তাহলে সেটি একটি হত্যাকাণ্ড—যা ফৌজদারি আইনের অধীনে বিচারযোগ্য অপরাধ। একইভাবে, কোনো সাধারণ নাগরিক নিহত হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা তদন্ত ও বিচার করা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি ঘোষণা দেয় যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় মামলা হবে না বা বিচার চলবে না, তবে তা আইনের শাসনের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে।
আইনের শাসনের মূল দর্শন হলো—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, আন্দোলনে অংশগ্রহণ, মতাদর্শ বা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক—কোনোটিই অপরাধকে বৈধতা দিতে পারে না। যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপট দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতার দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী একই নজির দেখিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নিতে উৎসাহিত হতে পারে। এটি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তবে দায়মুক্তির পক্ষে কিছু যুক্তিও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা, জাতীয় পুনর্মিলন বা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কখনও কখনও সীমিত দায়মুক্তি প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষত যখন রাষ্ট্র একটি উত্তাল রাজনৈতিক অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তখন প্রতিশোধমূলক বিচার না করে একটি “ট্রানজিশনাল জাস্টিস” কাঠামো গ্রহণ করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন এ ধরনের একটি উদাহরণ, যেখানে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি নয়, বরং সত্য স্বীকার ও দায় স্বীকারের বিনিময়ে শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যদি দায়মুক্তি দেওয়া হয় বিনা তদন্তে, বিনা সত্য উদ্ঘাটনে, বিনা ভুক্তভোগীদের মতামত গ্রহণে—তাহলে সেটি পুনর্মিলন নয়; বরং সেটি দায় এড়ানো। একটি রাষ্ট্র তখনই নৈতিক উচ্চতায় অবস্থান করতে পারে, যখন সে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকে। কে গুলি চালিয়েছে, কে ফায়ার অর্ডার দিয়েছে, কোথায় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে, কোথায় উসকানি ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে দায়মুক্তি দেওয়া হলে সন্দেহ, ক্ষোভ ও বিভাজন থেকে যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাধারণত নিরপেক্ষ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য গঠিত হয়। তাদের প্রধান কাজ নির্বাচন আয়োজন, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নিরপেক্ষতা রক্ষা করা। যদি এমন সরকার একতরফাভাবে একটি পক্ষকে দায়মুক্তি দেয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—তারা কি তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে? রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে।
দায়মুক্তির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে ভুক্তভোগীদের ওপর। নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবার, আহতদের পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বা সাধারণ নাগরিক—তাঁদের ন্যায়বিচারের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? একটি পরিবার যদি তাদের প্রিয়জন হারায়, আর রাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিচার হবে না, তাহলে সেই পরিবার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাতে পারে। ন্যায়বিচার কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি সামাজিক আস্থার ভিত্তি।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের যুক্তিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় আন্দোলনের সময় বিশৃঙ্খলা, উসকানি, ভুয়া তথ্য বা উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ জটিল হতে পারে। কিন্তু জটিলতা দায়মুক্তির যৌক্তিকতা নয়; বরং নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা বাড়ায়। সুতরাং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা হতে পারে—সম্পূর্ণ দায়মুক্তির পরিবর্তে একটি স্বাধীন বিচারিক তদন্ত কমিশন গঠন করা। সেখানে সব পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে, ফরেনসিক ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ হবে, দায় নির্ধারণ হবে ব্যক্তি পর্যায়ে। যারা গুরুতর অপরাধে জড়িত নয় কিন্তু আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নমনীয়তা দেখানো যেতে পারে। কিন্তু হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য।
রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়; ন্যায়বিচারে। দায়মুক্তি যদি ন্যায়বিচারের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন সহিংসতার দিকে গেলে অংশগ্রহণকারীরা ভাবতে পারে—পরিবর্তন হলে দায়মুক্তি মিলবে। এটি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
এখানে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার কাঠামোর বিষয়টিও বিবেচ্য। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, প্রাণহানি ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর তদন্ত ও বিচার রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। দায়মুক্তি দিয়ে সে দায় এড়ানো যায় না। আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও এতে প্রভাবিত হতে পারে। একটি জাতি তখনই পরিপক্ক হয়, যখন সে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচারের নীতি মেনে চলে। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যদি সত্যিই সহিংসতা, পুলিশ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে থাকে, তবে তার পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। দায়মুক্তি দিয়ে সাময়িক রাজনৈতিক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না।
পরিশেষে বলা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্তের মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত—আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার। রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু তা কখনও বিচারবহির্ভূত দায়মুক্তির অজুহাত হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি নিজেই আইনের সীমা অতিক্রম করে, তবে নাগরিকদের কাছ থেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রত্যাশা করা কঠিন হয়ে পড়ে। দায়মুক্তির পরিবর্তে সত্য উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হতে পারে একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের ভিত্তি।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক।