ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুরমার সঙ্গে সম্প্রতি একটি চীনা ছেলের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। পরিচয় মাত্র এক মাস। কেউ কারো ভাষা বোঝে না। ইংরেজি জানে না। তারা ভয়েস ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে কথা বলে। এমন একটি সম্পর্কের মধ্যে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া, অনেকের কাছে আশ্চর্যজনক, অনেকে এটিকে কল্পনাপ্রসূত মনে করতে পারে। কিন্তু এটি বাস্তব।
গত ২৫ মে, ঢাকার চীনা দূতাবাস থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়। তারা তাদের নাগরিকদের অনুরোধ করে, এমন বিয়েতে জড়াবেন না। বিশেষ করে তাদের নিঃসঙ্গ পুরুষরা যেন বিদেশি স্ত্রী কেনার ফাঁদে না পড়ে। অনলাইন ডেটিং, সোলম্যাট সাইট স্ক্যামে জড়াবেন না এবং কোনো এজেন্টের ফাঁদে পা দেবেন না। দূতাবাস সরাসরি বলেনি যে চীনা পাত্ররাই সবসময় এমন কাজ করে, তবে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পাত্ররা স্ক্যামে পড়তে পারে।
অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। পাত্ররা মেয়েদের বিয়ে করে নিয়ে যায় এবং বিক্রি করে দেয়। এভাবে অনেক মেয়ের জীবন বিপন্ন হয়ে যায়। এত সতর্কবার্তার পরও দেশের কিছু মেয়েরা এতে চোখ বন্ধ রাখে। তারা নিজের ঝুঁকি বুঝে না। মাসখানেক আগে আমি চাইনিজদের মাধ্যমে নারী পাচার বিষয়ে একটি পোস্ট করেছি। আমার আশা ছিল, যদি কোনো পরিচিত মেয়ের চোখ পড়েও, হয়তো বিয়েটা রোধ করা যাবে। কিন্তু মেয়েটি পোস্টটি দেখার পরও বলেছিল, “আমার বয়ফ্রেন্ড এমন নয়। ভিডিও কলে ওর বাবা-মাকে দেখেছি। ওরাও বিয়েতে রাজি।”
সাধারণত ভিডিওকলে যে কাউকে বাবা-মা হিসেবে সাজানো যায়। সে কি বোঝার সুযোগ পেয়েছে, আসল বাড়ি-ঘর দেখা হয়নি। অথচ পরিচয় দুই সপ্তাহের। এই দুই সপ্তাহের পরিচয়েই জীবনসঙ্গীর সঙ্গে বিয়ে করা হয়েছে। মেয়েটি শোনেছিল তার বয়ফ্রেন্ডের কথাটি, “তোমার পরিচিত কোনো গরীব ঘরের মেয়ে হবে? আমার এক সিনিয়র ফ্রেন্ড, একটু বয়স বেশি, পাত্রী খুঁজছেন। পাত্রী ম্যানেজ করলে টাকা পাব। দেখো কি করা যায়।”এই কথাটি স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ যে, সম্পর্কের মধ্যে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তবুও মেয়েটি রাজি হয়ে বিয়ে সম্পন্ন করেছে। আমি দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। সামাজিক যোগাযোগ বলতে মূলত ফেসবুক। ইনস্টাগ্রাম বা টুইটার অ্যাকাউন্ট থাকলেও তা তেমন ব্যবহার করি না। আমাদের দেশের অনেক মেয়েই বেনামী এপ্স ব্যবহার করে, যেমন **Talk, **Talk। এদের অধিকাংশই দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের। গ্রামাঞ্চল থেকে আসা। তারা এপ্স ইনস্টল করার সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা করে যে, কাউকে পটিয়ে বিয়ে করা হবে। যে ভাবে তারা এই অ্যাপ খুঁজে পায় তা সহজ। ইউটিউব বা ফেসবুকের মুখরোচক বিজ্ঞাপন। তারপর চাইনিজ স্ক্যামারদের ফাঁদে পড়ে। প্রেম হয়। ছেলে বলে সে নাস্তিক। তবে মেয়ের ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি। মেয়েটি আরও ভীষণভাবে মুগ্ধ হয়। এরপর ছেলে বাংলাদেশে আসে। এলাকার মানুষ চাঞ্চল্য অনুভব করে। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে ভয় বা লজ্জা কাজ করে না। তারা মিডিয়াতে ইন্টারভিউ দিয়ে নিজের কাজের ‘গর্ব’ দেখায়।
দুই সপ্তাহ আগে এক মেয়ে পালিয়ে আসে। অনলাইনে প্রেম, বিয়ে। সে নিজে বিয়ে সম্পন্ন করে তার খালাতো বোনকেও বিয়ে দিয়ে চীনে পাঠায়। যাওয়ার পর বুঝতে পারে, তারা ফাঁদে পড়েছে। জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি চলছে। নিজে পালাতে পারলেও খালাতো বোন এখনও বন্দি। গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে চীনা যুবকরা আসছে। প্রথমে বেনামী এপ্সের মাধ্যমে মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। পরে বাংলাদেশে এসে ইসলাম বা মেয়ের ধর্ম গ্রহণ করে মুগ্ধ করে। হিন্দু ধর্মের মেয়েদেরও পটিয়েছে এমন একটি কেস রয়েছে। এরপর বিয়ে করে তাদের দেশে নিয়ে যায়।
নিউজ সূত্র অনুযায়ী, তাদের চীনের গ্রামে কোনো বয়স্ক পুরুষের স্ত্রী হিসেবে বিক্রি করা হয়, নয়তো জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি করানো হয়। এক সন্তাননীতির কারণে চীনে নারী সংকট। বুড়োরা বিয়ে করার জন্য মেয়ে পাচ্ছে না। এই সংকট পূরণের জন্য নারী পাচার করা হচ্ছে। টার্গেট দেশ: বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান। এদের মধ্যের দরিদ্র বা লোভী মেয়েদের পটানো সহজ।
২০১৯ সালের রিপোর্টে পাকিস্তানে দুই বছরে ৬০০ মেয়েকে বিয়ের নামে পাচার করা হয়। বেশিরভাগ দরিদ্র খ্রিস্টান মেয়েরা লক্ষ্য ছিল। সরকারের পদক্ষেপ তখন দৃশ্যমান হয়েছিল। আমাদের দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া কবে হবে, তা দেখা বিষয়। সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ভুলেও স্বল্প পরিচয়, অনলাইন প্রেম বা বিয়ের ফাঁদে পা দেবেন না। এখনই সময়, “Save Our Bangladeshi Sisters from Chinese Men” ক্যাম্পেইন চালানোর।
মানুষ সচেতন হলে জীবন রক্ষা পাবে। মানবিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সামাজিক দায়িত্ব—সব একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। প্রেম যদি সত্যি হয়, সম্মান দিয়ে সম্পর্ক হবে। কিন্তু অজ্ঞতা, তাড়াহুড়ো ও অনিরাপদ পদক্ষেপ—ফলাফল শুধুই বিপর্যয়। আমাদের সমাজে এমন ঘটনা প্রতিরোধের দায়িত্ব সবার। মেয়েরা যদি সতর্ক হয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একযোগে সচেতন হয়—তবে জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: অন্তর মাশঊদ
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।