বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক ভারসাম্য, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির এক কেন্দ্রবিন্দু। যখন ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বা সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তার প্রভাব সরাসরি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল, রেমিটেন্সনির্ভর ও শ্রমবাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির জন্য এই ধরনের সংঘাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন; তাঁদের উপার্জিত অর্থ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান কেবল নীতিগত বা আদর্শিক প্রশ্ন নয়; এটি একটি বাস্তববাদী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের সময়ে আবেগতাড়িত অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন হিসাব-নিকাশভিত্তিক, নাগরিককেন্দ্রিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষাকারী কৌশল। এই প্রবন্ধে আলোচিত হবে—ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য কোন ধরনের কৌশলগত অবস্থান যুক্তিযুক্ত হতে পারে, কেন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও রেমিটেন্স বিবেচনায় নীতিনির্ধারণ জরুরি, এবং কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কৌশলগত ও নাগরিকসুরক্ষামুখী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান সুপরিচিত। প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষত সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইন—থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স আসে। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নির্মাণখাত, সেবা খাত, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও গৃহকর্মে নিয়োজিত। তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তা, বসবাসের পরিবেশ এবং আইনগত সুরক্ষা সরাসরি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। যদি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা আঞ্চলিক রূপ নেয়, তবে এই দেশগুলোও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথম আঘাতটি আসবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর—চাকরি হারানো, বেতন বন্ধ হওয়া, জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন, এমনকি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অতএব বাংলাদেশের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—নিজ দেশের নাগরিকদের জীবন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি একটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে বাংলাদেশি শ্রমবাজার কার্যত নেই বললেই চলে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক মিলিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে যে কোনো কূটনৈতিক বিবৃতি, ভোটাভুটি, আন্তর্জাতিক ফোরামে অবস্থান বা সামরিক উত্তেজনা বিষয়ে মন্তব্য করার সময় এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নিজের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করা—এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে: বাংলাদেশের কি প্রকাশ্যে ইরানের বিরোধিতা করা উচিত? নাকি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত? বাস্তবতা হলো—সরাসরি কোনো পক্ষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক। আবার উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে রয়েছে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগনির্ভর সম্পর্ক। এই বহুমাত্রিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে কৌশলগত বিচক্ষণতা।
বাংলাদেশের উচিত একটি নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা—যা হবে সংঘাত নিরসন, শান্তিপূর্ণ সমাধান, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে। একই সঙ্গে পর্দার আড়ালে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা দরকার—বিশেষত সেই দেশগুলোর সঙ্গে যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বেশি সংখ্যায় কর্মরত। প্রকাশ্য বিবৃতিতে উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা পরিহার করে কৌশলগত শব্দচয়ন ব্যবহার করা জরুরি।
উদাহরণস্বরূপ, “সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান”, “আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা”, “নাগরিকদের সুরক্ষা”, “আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা”—এই ধরনের শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করে অবস্থান জানানো যায়, যা কোনো পক্ষের সরাসরি বিরোধিতা বা সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হবে না। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ জোরদার করে প্রবাসীদের নিরাপত্তা বিষয়ে নিশ্চয়তা আদায় করা যেতে পারে। এখানে ধর্মীয় অনুভূতি বা মতাদর্শগত অবস্থানকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে আনা উচিত নয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কূটনীতি পরিচালিত হয় জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো—প্রবাসী আয় ও শ্রমবাজার। ফলে যে কোনো আন্তর্জাতিক উত্তেজনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অর্থনৈতিক প্রভাব, রেমিটেন্স প্রবাহ, কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা এবং কনস্যুলার সুরক্ষার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী হতে পারে তা বিশ্লেষণ করাও জরুরি। প্রথমত, তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয়ত, নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত হতে পারে, ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের কাজ কমে যেতে পারে। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিদেশি কর্মীদের ওপর বিধিনিষেধ আসতে পারে। এই সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে। একটি সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে—ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য জরুরি সুরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করা, দূতাবাসগুলোতে সংকট ব্যবস্থাপনা সেল চালু করা, প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি রাখা এবং বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান করা। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়িয়ে নিশ্চিত করা যে প্রবাসীরা নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকবেন। এছাড়া বাংলাদেশের উচিত বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা—যেমন জাতিসংঘ বা নিরপেক্ষ জোটভুক্ত দেশগুলোর প্ল্যাটফর্মে—যেখানে শান্তিপূর্ণ সমাধান, আঞ্চলিক সংলাপ এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানো যায়। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি থাকবে দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে।
অন্যদিকে সরাসরি কোনো পক্ষকে আক্রমণাত্মক ভাষায় সমর্থন বা বিরোধিতা করলে তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চুকাতে হতে পারে। বিশেষ করে যদি তা শ্রমবাজারনির্ভর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, তবে এর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তাই “কৌশলগত নীরবতা” বা “পরিমিত বক্তব্য” অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে। এই প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশের সামরিক বা নিরাপত্তা সহযোগিতা। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণে সক্রিয়, কিন্তু আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার নীতি অনুসরণ করে না। সেই নীতিই বজায় রাখা উচিত। কোনো সামরিক জোটে সম্পৃক্ততা বা প্রতিরক্ষা অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হওয়া উচিত—“প্রথমে নাগরিক, তারপর অবস্থান।” প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও পেশাগত নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখা গেলে তবেই জাতীয় অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা, কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং শান্তির আহ্বান—এই তিনটি স্তম্ভে বাংলাদেশের অবস্থান গড়ে তোলা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নীতিনির্ধারণে আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। কতজন প্রবাসী কোথায় কর্মরত, তাঁদের কর্মচুক্তির অবস্থা কী, সম্ভাব্য ঝুঁকি কতটা—এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায়, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মতো জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম কৌশল হলো—ভারসাম্য, সংযম ও নাগরিককেন্দ্রিকতা। প্রকাশ্যে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থান না নিয়ে, কৌশলগত শব্দ ব্যবহার করে, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এবং প্রবাসীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করাই হবে রাষ্ট্রীয় বিচক্ষণতার পরিচায়ক। জাতীয় স্বার্থ রক্ষাই পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য—এবং সেই স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক, বিশেষত প্রবাসী শ্রমিকরা, যাঁদের পরিশ্রমে দেশের অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।
তারিখ : ৩/৩/২০২৬ ইং