জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের মোট ভূমির ৩০.৪% হচ্ছে বনভূমি। আর সে হিসেবে সারাবিশ্বের মোট বনভূমির আয়তন হচ্ছে ৪.০৬ বিলিয়ন হেক্টর বা ৪ কোটি ৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। যা কিনা এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর প্রাণের স্পন্দন টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
তবে জাতিসংঘের মতে, ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে সারাবিশ্বের আনুমানিক মোট প্রায় ২.৮ কোটি একর বনভূমি ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ। যা কিনা এক রকম নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাকে বিপদজনকভাবে বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করে।
এদিকে পরিবেশবাদী বিজ্ঞানীরা স্যাটালাইট ইমেজ ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, গত ২০২০ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন রেইন ফরেস্টের আনুমানিক প্রায় ৫,১১০ বর্গমাইল বনভূমি আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উতপন্ন মিলিয়ন মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড কিন্তু সরাসরি বায়ুমন্ডলেই চলে গেছে।
বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে কিন্তু সারাবিশ্বের অধিকাংশ সংরক্ষিত বনভূমি নির্বিচারে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যা মানব জাতি তথা সারা পৃথিবীর জীব জগতের অস্তিত্বের জন্য এক চরম হুমকি হিসেবে দেখা হয়। তবে মানুষের কারণে কোন দিন বিশ্বের সকল রেইন ফরেস্ট ধ্বংস হয়ে গেলে পরিবেশে কিন্তু এক মহা বিপর্যয় নেমে আসবে। বায়ুমণ্ডলে থাকা ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য একেবারে বিনষ্ট হয়ে তা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাকে অনেকটাই বৃদ্ধি করে দিতে পারে।
আমরা সাধারণভাবে মনে করে থাকি যে, গাছ থেকে পৃথিবীর অধিকাংশ অক্সিজেন পাওয়া যায়। তবে আমাদের এই ধারণাটি কিন্তু সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণা মতে, সমগ্র পৃথিবীতে অক্সিজেন উৎপাদনের আনুমানিক প্রায় ৬০% থেকে ৬৮% পর্যন্ত আসে সমুদ্র থেকে। মূলত সামুদ্রিক প্ল্যাঙ্কটন যেমন- প্রবাহিত উদ্ভিদ, শৈবাল এবং কিছু ব্যাকটেরিয়া যারা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে। আবার তার পাশাপাশি ‘প্রকলোরোক্কাস’ নামক একটি বিশেষ প্রজাতি রয়েছে যারা পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম সালোকসংশ্লেষী জীব। এই অতি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া স্থলভাগের সমস্ত গ্রীষ্মমন্ডলীয় রেইনফরেস্টের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে অক্সিজেন উৎপন্ন করে। তবে স্থলজ উদ্ভিদ যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে তা হলো যে, পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে থাকা ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশে তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, শুধুমাত্র দক্ষিণ আমেরিকার মহাবন আমাজনের পুরো বাস্তুতন্তে প্রায় ২২৫ মেট্রিক গিগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড মজুত রয়েছে। যাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘কার্বনপুল’ বলা যেতে পারে। আর আমাজনের এই গাছপালা ধ্বংস করা হলে এতে থাকা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড সরাসরি পৃথিবীর বায়ু মণ্ডলে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে বায়ু মণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে কমপক্ষে ৩০% পর্যন্ত বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশাঙ্খা করা হয়।
বর্তমানের পৃথিবীর বায়ু মণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ০.০৪% থেকে তা মাত্র ০.০৫% এ বৃদ্ধি পেলেও তা কিন্তু পৃথিবীর জন্য হবে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। এখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ০.০৫% কে খুবই অল্প পরিমাণ মনে করা হলেও তা কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। তার সাথে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রী পর্যন্ত বৃদ্ধি করার জন্য এটিই যথেষ্ঠ হয়ে যাবে।
এখানে প্রথমেই আমাদের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড আসলে কি কাজ করে তা আমাদের প্রথমে জানতে হবে। বায়ুমণ্ডলের থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড সূর্যের তাপকে শোষণ করে তা বায়ুমণ্ডলেই আটকে রেখে গ্রীন হাউস সৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীর তাপমাত্রাকে বৃদ্ধি করে। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর সকল রেইন ফরেস্ট ধ্বংস হয়ে গেলে তাতে সঞ্চিত থাকা বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমন্ডলে রিলিজ হয়ে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ কমপক্ষে তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দিতে পারে। যা নিশ্চিতভাবেই, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাকে বৃদ্ধি করে অনেকটাই অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শত শত প্রজাতির প্রানী ও উদ্ভিদ।
লেখক :
সিরাজুর রহমান
বাংলাদেশ।