June 24, 2026, 9:34 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

জাতির জনকের প্রতি সম্মান: রাজনীতির ঊর্ধ্বে আমাদের দায়িত্ব

Reporter Name

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু মানুষ এমনভাবে জড়িয়ে থাকেন, যাদের অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। তারা হয়ে ওঠেন জাতির ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক অনিবার্য নাম হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নিয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। কিন্তু আজ আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমরা কি সত্যিই জাতির জনককে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে সম্মান দিতে পেরেছি? নাকি আমরা এখনো তাকে ঘিরে নোংরা রাজনীতির হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত? মতাদর্শগত বিরোধিতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা দলীয় বিভাজন—এসব গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান। কিন্তু সেই মতভেদ যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে একটি জাতির প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে অপমান করা হয়, কটূক্তি করা হয় কিংবা তার অবদানকে অবজ্ঞা করা হয়, তাহলে তা কেবল রাজনৈতিক অসৌজন্যই নয়—এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সংকটেরও লক্ষণ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন, এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা—সবকিছুর মধ্যেই তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার ফলেই জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এই ইতিহাসকে কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যে আটকে রাখাও এক ধরনের অবিচার। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায়—কেউ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অন্ধ ভক্তির রাজনীতি করেন, আবার কেউ তাকে অবমাননার রাজনীতিতে ব্যবহার করেন। এই দুই চরম অবস্থানই আসলে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। কারণ ইতিহাসের একজন নেতাকে সম্মান জানানো মানে তার প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে একমত হওয়া নয়; বরং তার ঐতিহাসিক অবদানকে স্বীকার করা।

আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই, দেখব অনেক দেশেই তাদের জাতির প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে George Washington অথবা ভারতের ক্ষেত্রে Mahatma Gandhi—এই ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের অবদানকে অবমাননার মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার প্রবণতা খুব কম দেখা যায়। কারণ তারা জানে, একটি জাতির প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বকে সম্মান দেওয়া মানে সেই জাতির আত্মপরিচয়কে সম্মান দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই একটি ভিন্ন চিত্র দেখি। এখানে ইতিহাসকে প্রায়ই দলীয় রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কখনো বঙ্গবন্ধুর নামকে অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণ করা হয়, আবার কখনো তাকে অপমান করার মাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর চেষ্টা করা হয়। এই দুই প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত জাতির জন্য ক্ষতিকর।

প্রশ্ন হলো—কেন আমরা এমন করছি? কেন আমরা নিজেদের জাতির প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে সম্মান দিতে দ্বিধাবোধ করি? অথচ অন্য দেশের জাতীয় নেতাদের সামনে আমরা মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাতে কোনো সংকোচ বোধ করি না। এটি কি আমাদের মানসিকতার কোনো দুর্বলতার পরিচয় নয়? এই দ্বিচারিতার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার প্রবণতা কাজ করেছে। রাজনীতিতে মতভেদকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে দেখি। ফলে ইতিহাসের ব্যক্তিত্বরাও এই সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন।

দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক চর্চায় ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে জানার সুযোগ অনেক সময় সীমিত থাকে। ইতিহাস যদি রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে যায়, তাহলে নতুন প্রজন্মের কাছে সত্যিকার ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয় এবং কখনো কখনো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের প্রতিও অবজ্ঞা প্রদর্শন করে।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ একজন অবমাননাকর মন্তব্য করলে সেটি মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই পরিস্থিতি আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতাকে আরো দুর্বল করে দেয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায়—আমরা কি সত্যিই একটি পরিণত জাতি হতে চাই? যদি চাই, তাহলে আমাদের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ইতিহাসকে দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে, সেটিকে একটি যৌথ জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা কিংবা বিশ্লেষণ অবশ্যই হতে পারে। এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি শালীনতার সীমা অতিক্রম করে অপমানের পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে তা আমাদের নিজেদেরই মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। একটি জাতির পরিণত হওয়ার অন্যতম লক্ষণ হলো—সে তার ইতিহাসকে সম্মান করতে জানে। ইতিহাসের নেতাদের নিয়ে মতভেদ থাকলেও তাদের অবদানকে অস্বীকার করে না। আমরা যদি সত্যিই নিজেদেরকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে আমাদেরও সেই পথেই এগোতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জাতির জনককে সম্মান জানানো মানে কেবল তার নাম উচ্চারণ করা নয়; বরং তার আদর্শ এবং মূল্যবোধকে ধারণ করা। বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ কল্পনা করেছিলেন—সেটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। যদি আমরা সেই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে না পারি, তাহলে কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন কোনো অর্থ বহন করবে না। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে—কৃতজ্ঞতা একটি মহান গুণ। যে জাতি তার ইতিহাসের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে জানে না, সেই জাতি ভবিষ্যতের দিকেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগোতে পারে না। ইতিহাসের প্রতি অকৃতজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে।

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস এবং স্বাধীনতার চেতনা। কিন্তু সেই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের মানসিকতাকে আরো উদার ও পরিণত করতে হবে।

জাতির জনককে সম্মান দেওয়া মানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক সত্যকে স্বীকার করা। যে মানুষটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাকে সম্মান দেওয়া সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আজ আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমরা কি আমাদের ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকতে পারব? আমরা কি মতভেদ থাকা সত্ত্বেও একজন জাতীয় নেতার প্রতি ন্যূনতম সম্মান বজায় রাখতে পারব? আমরা কি নিজেদের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে একটি উচ্চ মানসিকতার জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত আচরণের ওপর। যদি আমরা সত্যিই একটি উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের ইতিহাসকে সম্মান করতে শিখতে হবে। আমাদের শিখতে হবে—মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু অপমান নয়; সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু অবমাননা নয়।

একটি জাতির আত্মপরিচয় তার ইতিহাসের মধ্যেই নিহিত থাকে। সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে সম্মান করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়; এটি একটি জাতির জন্মকথাকে সম্মান করা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে—আমরা কি নিজেদের ইতিহাসের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারব? নাকি আমরা নিজেদের বিভাজন আর সংকীর্ণতার মধ্যেই আটকে থাকব? যদি আমরা সত্যিই একটি আত্মমর্যাদাবান জাতি হতে চাই, তাহলে আমাদের উত্তর একটাই হওয়া উচিত—আমরা ইতিহাসকে সম্মান করব, মতভেদকে সভ্যতার সঙ্গে প্রকাশ করব, এবং জাতির জনককে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় স্মৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেব। কারণ একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে পরিণত হয়, যখন সে তার ইতিহাসকে সম্মান করতে শেখে এবং তার প্রতিষ্ঠাতাদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে।

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।

তারিখ-৯/৩/২৬ইং


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা