August 26, 2026, 6:10 am
শিরোনামঃ
জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : একজন সেনাপ্রধানের কর্মযাত্রার মূল্যায়ন মতলব উত্তরের গজরা ইউনিয়ন মাদক প্রতিরোধ পরিষদের আত্মপ্রকাশ সুন্দরবনে বনদস্যু ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’র তাণ্ডব ; ট্রলারসহ ৫ জেলে অপহৃত জেনারেল ড. আজিজ আহমেদ : বিজিবির আস্থা পুনর্নির্মাণের চার বছরের অভিযাত্রা মতলব উত্তরের গজরা ইউনিয়নে সাবিনা ইয়াছমিনের ছয় দফা কর্মসূচির লিফলেট বিতরণ বাগেরহাটের দিঘি থেকে কক্সবাজারের সাফারি পার্কে ; অনশনের পর নতুন ঠিকানায় ধলাপাহাড় মতলব উত্তরে ট্রান্সফরমার চুরির মালামাল উদ্ধার, ভাঙারি ব্যবসায়ী টানা আনোয়ার আটক মতলব উত্তরে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস মতলব উত্তরে মাদকবিরোধী অভিযানে আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী বিল্লালসহ গ্রেপ্তার ১০ শিশু নাঈমকে বাঁচাতে সহয়তার আকুতি মা-বাবার

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : একজন সেনাপ্রধানের কর্মযাত্রার মূল্যায়ন

Reporter Name

বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে সেনাপ্রধানের পদটি কেবল একটি সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক দায়িত্বের নাম নয়; এটি একই সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, সক্ষমতা, আধুনিকায়ন, জাতীয় নিরাপত্তা-চিন্তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সামরিক ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন সেনাপ্রধান তাঁর দায়িত্ব পালন করেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, কিন্তু তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, নেতৃত্বের ধরন এবং বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর কর্মকাল পরবর্তী সময়েও আলোচিত হয়। এই কারণেই একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু তাঁর সময়ের সাফল্যের তালিকা তৈরি করলেই চলে না; একই সঙ্গে দেখতে হয় তিনি কোন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কী ধরনের পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন, প্রতিষ্ঠানকে কোন দিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বকে ঘিরে কী ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মজীবন সেই অর্থে বিশেষভাবে আলোচনাযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬তম সেনাপ্রধান হিসেবে ২৫ জুন ২০১৮ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২৪ জুন ২০২১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরকারি তালিকাতেও তাঁর দায়িত্বকাল এই সময় হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর আগে তিনি কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এরও আগে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবি—এর মহাপরিচালক হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। ফলে সেনাপ্রধান হওয়ার আগেই তাঁর কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ের কমান্ড, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রশাসন, প্রশিক্ষণ এবং বাহিনী পরিচালনার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছিল।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সামরিক কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় বিজিবির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে। ২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি তৎকালীন মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় বিজিবির মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর কর্মজীবনে আর্টিলারি ইউনিট, ব্রিগেড, সেক্টর এবং বিভিন্ন কমান্ড পর্যায়ের দায়িত্বের পাশাপাশি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও ছিল।

বিজিবির নেতৃত্বে তাঁর সময়টি ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তখন সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নতুন কাঠামো, নতুন পরিচয় এবং নতুন পেশাদারিত্বের ধারায় এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বিডিআর বিদ্রোহ ও পিলখানার মর্মান্তিক ঘটনার পর বাহিনীর সাংগঠনিক পুনর্গঠন, জনআস্থা পুনঃস্থাপন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ সেই সময় বিজিবির নেতৃত্বে ছিলেন। ২০১৬ সালে তাঁকে বিজিবি থেকে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের জিওসি হন।

বিজিবিতে তাঁর কর্মকাল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৫ সালে তিনি জানিয়েছিলেন যে সীমান্তে আন্তঃদেশীয় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবিলায় বিজিবি ও ভারতের বিএসএফের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে তিনি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বাহিনীর পুনর্গঠন-সংস্কারের বিষয়েও কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর সামরিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা প্রচলিত সামরিক কমান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সীমান্ত, নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার মতো জটিল ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন। তবে তাঁর বিজিবি অধ্যায়ের মূল্যায়ন করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও উপেক্ষা করা যায় না। সীমান্তে প্রাণহানি ও সীমান্ত হত্যার প্রশ্নে তিনি নিজেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৬ সালে বিজিবির মহাপরিচালকের পদ ছাড়ার সময় তিনি সীমান্ত হত্যার ঘটনা ঠেকাতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেন এবং ফেলানী হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তুষ্টির কথা জানান। এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশ করে—সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক, সীমান্ত বাহিনীর আচরণ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত।

এরপর আসে তাঁর সেনাপ্রধান হওয়ার অধ্যায়। ২০১৮ সালের জুনে সরকার তাঁকে পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৫ জুন ২০১৮ থেকে তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই দিনে জেনারেল পদে উন্নীত হন। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রায় চার দশকের সামরিক কর্মজীবন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। একজন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব মূলত বহুমাত্রিক। তাঁকে একই সঙ্গে বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, জনবল ব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়ন, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংযোজন, সামরিক কূটনীতি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জাতীয় প্রয়োজনে বাহিনীর ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের দায়িত্বকালেও এই বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট ছিল।

তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান আলোচ্য ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন। বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত Forces Goal 2030-এর ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া তাঁর দায়িত্বকালেও চলমান ছিল। ২০১৯ সালে তিনি নিজেই বলেছিলেন যে Forces Goal 2030-এর আলোকে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন অব্যাহত রয়েছে। একই বক্তব্যে তিনি যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছিলেন। আধুনিক সেনাবাহিনী বলতে এখন শুধু বেশি অস্ত্র বা বেশি সৈন্য বোঝায় না। আধুনিক সামরিক শক্তির মূল উপাদানের মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, যৌথ অভিযান, সাইবার সক্ষমতা, লজিস্টিকস, চিকিৎসা সহায়তা, দ্রুত মোতায়েন এবং আন্তর্জাতিক মানের অপারেশনাল দক্ষতা। তাই Forces Goal 2030-এর অধীনে আধুনিকায়নের যে ধারাটি আগে থেকেই চলছিল, জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময় সেটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়।

সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর বক্তব্যগুলোতেও প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের ওপর জোর দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২০ সালে ১৭ পদাতিক ডিভিশনের নতুন ইউনিটগুলোর পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে তিনি সেনাসদস্যদের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি বাহিনীকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা বলেন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়— জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের নেতৃত্বের বক্তব্যে সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বকে পাশাপাশি দেখা হয়েছে। বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ঐতিহাসিকভাবেই শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অবকাঠামো নির্মাণ, সড়ক যোগাযোগ, উদ্ধার ও অন্যান্য জাতীয় জরুরি কাজে অংশ নিয়ে থাকে। ফলে একজন সেনাপ্রধানের নেতৃত্ব মূল্যায়নের সময় এই ‘সিভিল-সাপোর্ট’ ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়াও প্রয়োজন।

সেনাবাহিনীর প্রকৌশল সক্ষমতার ব্যবহারও তাঁর দায়িত্বকালে গুরুত্ব পেয়েছিল। ২০১৯ সালে তাঁর বক্তব্যে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং সীমান্ত সড়ক প্রকল্পে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ভূমিকার কথা উঠে আসে। তিনি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ব্যবহারের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। একজন সেনাপ্রধানের কর্মযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী দেশ। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময়েও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সামরিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়ে সক্রিয় উদ্যোগ দেখা যায়।

২০২১ সালের শুরুতে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। একই সফরে তিনি জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরও বেশি অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেন।

জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শান্তিরক্ষা শুধু সৈন্য পাঠানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কমান্ড পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, বিমান ও হেলিকপ্টার, ক্ষতিপূরণ, লজিস্টিকস এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণ। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছিল। তিনি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত Army Chiefs’ Conclave-এও তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যে আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আগের তুলনায় জটিল হয়েছে এবং প্রযুক্তি, অরাষ্ট্রীয় শক্তি, রাজনৈতিক সংকট ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা শান্তিরক্ষীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। এখান থেকে ড. আজিজ আহমেদের সামরিক দর্শনের একটি দিক অনুমান করা যায়—তিনি প্রচলিত সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা তৈরিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের চরিত্র বদলাচ্ছে। ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যযুদ্ধ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি সামরিক পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে। একজন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব হলো তাঁর বাহিনীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের দায়িত্বকালেও এই ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার প্রতিফলন তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে পাওয়া যায়।

তাঁর সামরিক কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড। ২০১৬ সালে বিজিবি থেকে ফিরে তিনি এই কমান্ডের জিওসি হন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি প্রকাশনায় তাঁর দায়িত্বকালে প্রশিক্ষণ, ডকট্রিন উন্নয়ন এবং বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে এই অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছিল বলে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। একজন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংগঠনিক সংস্কৃতি। সেনাবাহিনী একটি কঠোর শ্রেণিবিন্যস্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে শৃঙ্খলা অপরিহার্য। কিন্তু আধুনিক সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য শৃঙ্খলার পাশাপাশি পেশাদারিত্ব, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং অধস্তন পর্যায়ের কল্যাণও গুরুত্বপূর্ণ। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের বিভিন্ন বক্তব্যে সৈনিকদের কল্যাণ, প্রশিক্ষণ এবং পেশাদারিত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে একজন সেনাপ্রধানের মূল্যায়ন কেবল ইতিবাচক দিক দিয়ে করলে তা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয় না।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আল জাজিরার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের নামে একপেশে একটি রির্পোট তৈরি করে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এবং তাতে বিভিন্ন ভিত্তিহীন ও মনগড়া অভিযোগ উত্থাপন করে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাংবাদিকতাগত ও গবেষণাগত সতর্কতা প্রয়োজন ছিলো সংবাদমাধ্যমটির কিন্তু তারা সেটা করেনি। বরং মনগড়া গল্প তৈরি করে একটি বিভ্রান্ত ছড়ায়, যা জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ ডয়েচভেলের সাথে এক ঘন্টার দীর্ঘ স্বাক্ষাতকারে বলেছেন এবং তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। যদিও সেই চ্যালেঞ্জ আল জাজিরা খন্ডন করতে পারেনি। অভিযোগ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের নামে মনগড়া দাবি এবং প্রমাণিত সত্য—এই তিনটি বিষয় এক নয়। কোনো সংবাদমাধ্যম বা আন্তর্জাতিক সংগঠন কোনো অভিযোগ উত্থাপন করলে সেটিকে সরাসরি প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। একইভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যও আলোচনায় থাকা প্রয়োজন, যা আল জাজিরা করেনি। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ ওই সময় মিত্যা ও বিভ্রান্তিকর ঐ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারিত বক্তব্যকে মিথ্যা ও মনগড়া বানানো বলে অভিহিত করেছিলেন। তাই তাঁর কর্মজীবন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অভিযোগগুলোর অস্তিত্ব মূল্যহীন কেননা সেগুলো রাষ্ট্রিয় আইন দ্বারা প্রমাণীত হয়নি, কিংবা আল জাজিরা সেগুলোর কোন সঠিক ও সত্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারিনি।

২০২০ সালের শেষদিকে সেনাবাহিনীকে ঘিরে গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা নিয়েও জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি সেনাসদস্যদের উদ্দেশে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং বলেন যে গুজবের মাধ্যমে বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যাবে না। এই ঘটনাটি দেখায় যে তাঁর দায়িত্বকালের শেষ পর্যায়ে সামরিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তথ্যযুদ্ধ ও জনমত ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। একজন সেনাপ্রধানের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক একটি জটিল ক্ষেত্র। সামরিক বাহিনী স্বাভাবিকভাবেই অনেক তথ্য প্রকাশ করতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, অপারেশনাল তথ্য এবং কৌশলগত সক্ষমতা গোপন রাখা প্রয়োজন। আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জনসাধারণের একটি স্বাভাবিক তথ্যের অধিকারও রয়েছে। ফলে সামরিক গোপনীয়তা ও জনস্বচ্ছতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মজীবনের মূল্যায়নে বিজিবি অধ্যায়টিকে আবারও সামনে আনতে হয়। কারণ সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব বুঝতে হলে তাঁর আগের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অভিজ্ঞতা বোঝা প্রয়োজন। তিনি যখন বিজিবির দায়িত্ব নেন, তখন বাহিনীটি একটি বড় সাংগঠনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, চোরাচালান প্রতিরোধ, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং সীমান্তে মানবিক সংকট—সবকিছুই বিজিবির দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সময়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস মোকাবিলায় সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বের আরেকটি দিক ছিল বাহিনীকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। বিজিবি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত কার্যক্রম এবং সীমান্ত ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সময়ও তাঁর দায়িত্বকাল ছিল। ২০১৬ সালে সীমান্ত ব্যাংকের কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় বিজিবির কল্যাণমূলক কাঠামোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। যদিও এসব উদ্যোগকে ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে এককভাবে আরোপ করা ঠিক হবে না, কারণ এগুলো ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সিদ্ধান্তের অংশ; তবে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের প্রশাসনিক ভূমিকা অবশ্যই আলোচনা ও প্রশংসার যোগ্য।

সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময়কাল ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ২০১৮ সালে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই বছরের শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁর পুরো দায়িত্বকালজুড়ে সরকার, রাষ্ট্র ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ক জনআলোচনার বিষয় ছিল। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর তিনি সেটা অত্যান্ত সফল ও সাবলীলভাবে করতে পেরেছেন। এই জায়গায় সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত অবস্থান, বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে একজন সেনাপ্রধানকে সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করে মূল্যায়ন করা যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়। সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তন, জাতীয় সংকট ও সামাজিক অস্থিরতার সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবসময়ই জনআলোচনার কেন্দ্রে থাকে। তিনি সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালণকালে সেনাবাহিনীকে সকল ধরণের সমালোচনা থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের দায়িত্বকালেও সেনাবাহিনী বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগ ও উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ, সড়ক যোগাযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ অব্যাহত ছিল। ২০১৯ সালে তাঁর বক্তব্যে এই ভূমিকা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তিনি সেনাবাহিনীকে শুধু সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশীদার হিসেবেও তুলে ধরেন। এরপর২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিল বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা, জনসচেতনতা, লজিস্টিকস এবং বিভিন্ন জরুরি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা। বৈশ্বিক মহামারি সামরিক বাহিনীর প্রচলিত নিরাপত্তা ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। একজন সেনাপ্রধানের জন্য এটি ছিল একটি অপ্রচলিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পরীক্ষা। তা তিনি সফলতার সাথে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক সামরিক কূটনীতিও সক্রিয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র সফর, জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষণ ও শান্তিরক্ষা সহযোগিতা—এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক কূটনীতির বিস্তৃত পরিসরকে নির্দেশ করে। ২০২১ সালে জাম্বিয়া সফরের সময় তিনি সে দেশের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। এই সামরিক কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, শান্তিরক্ষা ও যৌথ প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। চতুর্থত, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কূটনীতিকে আরও বহুমাত্রিক করে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি। বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। সামরিক কূটনীতির ক্ষেত্রে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই একজন সেনাপ্রধানের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মূল্যায়নের সময় দেখতে হয়, তা কতটা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ। তিনি সেটা তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে সবার সাথে সমান সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করে গেছেন।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময় বাংলাদেশ-সৌদি আরব সামরিক সহযোগিতাও আলোচনায় আসে। ২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ও সমর্থন সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে বাংলাদেশি সামরিক সদস্যদের সৌদি আরবে মোতায়েনসহ বিভিন্ন সহযোগিতার বিষয় ছিল। এই ধরনের সামরিক কূটনৈতিক উদ্যোগকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসরের অংশ হিসেবে দেখা যায়। সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বাহিনীর সাংগঠনিক সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব। নতুন ইউনিট, নতুন প্রশিক্ষণ কাঠামো এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত সক্ষমতা গড়ে তোলার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৭ পদাতিক ডিভিশনের নতুন ইউনিটগুলোর কার্যক্রমও Forces Goal 2030-এর সঙ্গে সম্পর্কিত আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। এখানে অবশ্য একটি প্রশ্নও আসে—সামরিক আধুনিকায়ন কতটা কার্যকরভাবে যুদ্ধক্ষমতা বাড়ায় এবং কতটা কেবল সরঞ্জাম ও অবকাঠামো বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে? আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি অস্ত্রের সংখ্যায় নয়; বরং সেই অস্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা, কমান্ড ও কন্ট্রোল, গোয়েন্দা সক্ষমতা, লজিস্টিকস, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায়। তাই জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময়কার আধুনিকায়নকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ গবেষকদের শুধু নতুন ইউনিট বা সরঞ্জামের তালিকা নয়, কার্যকর অপারেশনাল সক্ষমতার পরিবর্তনও বিশ্লেষণ করতে হবে। যাতে করে মানুষ বুঝতে পারে তিনি সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে কতটা কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘পেশাদারিত্ব’ শব্দটির ঘনঘন ব্যবহার। সেনাবাহিনী একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান—এটি তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে স্পষ্ট। তিনি শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সৈনিকদের আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের সমন্বয় চেয়েছেন। আধুনিক সামরিক নেতৃত্বে এই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু কঠোর শৃঙ্খলা দিয়ে একটি বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখা যায় না; নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, সহকর্মীর প্রতি দায়িত্ববোধ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যও প্রয়োজন।

তাঁর সেনাপ্রধানের দায়িত্বকাল শেষ হয় ২৪ জুন ২০২১। একজন সেনাপ্রধানের কর্মজীবনের মূল্যায়ন সাধারণত তিনটি স্তরে করা যায়। প্রথমত, তিনি প্রতিষ্ঠানকে কোথায় পেয়েছিলেন এবং কোথায় রেখে গেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি তাঁর সময়ের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করেছেন। তৃতীয়ত, তাঁর সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হয়েছে। এই তিনটি মানদণ্ডে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মকাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর সময়টি ছিল পরিবর্তন, আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার সময়। যা তিনি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা আর পেশাদারিত্বের মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।

প্রথম স্তরে দেখা যায়, তিনি এমন একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন যা ইতোমধ্যে Forces Goal 2030-এর অধীনে আধুনিকায়নের পথে ছিল। তাঁর দায়িত্বকালে সেই আধুনিকায়ন অব্যাহত থাকে এবং নতুন ইউনিট, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় সামনে আসে। তাই পুরো আধুনিকায়নের কৃতিত্ব এককভাবে তাঁর ওপর আরোপ করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি তাঁর দায়িত্বকালে সংঘটিত অগ্রগতিতে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করাও যুক্তিসঙ্গত নয়।

দ্বিতীয় স্তরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি আসে। তাঁর সময় ছিল রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, বৈশ্বিকভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং ২০২০-২১ সালে মহামারিতে আক্রান্ত একটি সময়। এই সময়ে সেনাবাহিনীকে প্রচলিত প্রতিরক্ষা দায়িত্বের পাশাপাশি দুর্যোগ ও জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জাতীয় ব্যবস্থাপনাতেও সহযোগিতা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, সামরিক কূটনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কও সক্রিয় ছিল।

তৃতীয় স্তরে আসে দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার। এখানেই মূল্যায়ন সবচেয়ে কঠিন। কারণ কোনো সামরিক নেতৃত্বের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। নতুন ইউনিট তৈরি বা কোনো অবকাঠামো উদ্বোধন সহজে দৃশ্যমান হলেও সামরিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, প্রশিক্ষণের মান, নেতৃত্বের বিকাশ এবং বাহিনীর আন্তর্জাতিক অবস্থান—এসবের ফল বুঝতে অনেক সময় লাগে।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রে তাঁর উত্তরাধিকারকে তাই শুধু ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’—এই দুই শব্দে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বরং বলা যায়, তাঁর সময়কাল ছিল উচ্চমাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও একই সঙ্গে উচ্চমাত্রায় প্রাকৃতিক দূর্যোগ সমন্বয়। তিনি যে সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই সময়ের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, শান্তিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ধারায় তাঁর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। এখানে সামরিক নেতৃত্বের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—একজন সেনাপ্রধানের সবচেয়ে বড় সাফল্য কি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, নাকি প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা? সম্ভবত দুটিই। একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী শুধু উন্নত অস্ত্রের বাহিনী নয়; এটি একটি আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান। জনগণ, রাষ্ট্র, সরকার, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বাহিনীর নিজস্ব সদস্যদের মধ্যে আস্থা ছাড়া সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি পূর্ণতা পায় না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মজীবন নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর সময়ে কতগুলো আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা কতটা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন এসেছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হয়েছে, সামরিক কূটনীতিতে কী নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে—এসব বিষয়ে পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

একজন সামরিক কর্মকর্তার জীবন মূল্যায়নের সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের গুরুত্ব বেশি। কারণ সেনাপ্রধানের পদ ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার জন্য নয়; এটি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের দায়িত্ব। তাই জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও মূল্যায়নের প্রধান প্রশ্ন হওয়া উচিত—তিনি যে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠান তাঁর সময়ে কী শিখেছে, কী পরিবর্তিত হয়েছে এবং কী ধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাঁর বিজিবি অধ্যায়ও এই মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পর্যন্ত তাঁর যাত্রা দেখায় যে তাঁর কর্মজীবন ছিল বিভিন্ন স্তরের কমান্ড ও প্রশাসনিক দায়িত্বে বিস্তৃত। বিজিবিতে তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও বাহিনী সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; আর সেনাবাহিনীতে তিনি প্রশিক্ষণ, ডকট্রিন, আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতার বৃহত্তর পরিসরে কাজ করেন। একজন সামরিক নেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সংকটে। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের দায়িত্বকালেও একাধিক সংকট ছিল—রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তন, মহামারি এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তথ্য ও প্রচারণার চাপ। তিনি এসব সংকটের মধ্যে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যে বারবার এই বিষয়টি এসেছে। তবে সংকট মোকাবিলার সাফল্য বিচার করতে শুধু নেতার বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বাস্তব ফলাফল, বাহিনীর কর্মক্ষমতা, জনআস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার সূচকও বিবেচনা করতে হয়। ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য এই জায়গাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মজীবনের আরেকটি শিক্ষা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির চেয়ে বড়। কোনো সেনাপ্রধানের সময়েই সেনাবাহিনী সৃষ্টি হয় না এবং তাঁর অবসরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান শেষও হয়ে যায় না। সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ইতিহাস, পূর্ববর্তী নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী নেতৃত্বের নীতি—সবকিছু মিলেই একটি প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। তাই জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের অবদান মূল্যায়নের সময় তাঁর পূর্বসূরি ও উত্তরসূরিদের ধারাবাহিকতার মধ্যেও তাঁকে দেখতে হবে। সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর দায়িত্বকাল তিন বছর। সময়ের হিসাবে এটি দীর্ঘ নয়। কিন্তু তিন বছর একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটানোর মতো সময়। এই সময়ের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ, নতুন ইউনিট, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও শান্তিরক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে তাঁর দায়িত্বকালেই এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাবমূর্তিকে বিতর্কিত করে তোলে।

ইতিহাস সাধারণত সরল রেখায় কোনো ব্যক্তিকে বিচার করে না। একজন মানুষ একই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে সফল, কিছু ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ থাকতে পারেন। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও সম্ভবত এমন বহুমাত্রিক মূল্যায়নই অধিক যুক্তিসঙ্গত। তাঁর সামরিক কর্মজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নেতৃত্ব, প্রশিক্ষণ ও ডকট্রিনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সেনাপ্রধান হিসেবে আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক কূটনীতিতে সক্রিয়তা। এই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই একজন গবেষক বা কলাম লেখকের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তিকে দেবত্ব দেওয়া যেমন ইতিহাসচর্চা নয়, তেমনি শুধু সামান্য অজুহাতের কারণে তাঁর দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবনের ইতিবাচক দিকগুলো মুছে ফেলাও নিরপেক্ষতা নয়।

সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মযাত্রা তাই বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর সময়ে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া চলেছে, আন্তর্জাতিক সামরিক যোগাযোগ বিস্তৃত হয়েছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা শক্তিশালী করার চেষ্টা হয়েছে এবং বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা হয়তো তাঁর কর্মজীবনকে আরও দূরত্ব থেকে মূল্যায়ন করবেন। তখন হয়তো রাজনৈতিক উত্তাপ কম থাকবে, নতুন সত্য প্রকাশিত হবে, সামরিক আধুনিকায়নের বাস্তব ফলাফল আরও স্পষ্ট হবে এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর প্রভাবও নির্ণয় করা সহজ হবে। সেই মূল্যায়নে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ভূমিকা কীভাবে লেখা হবে, তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে আজকের তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিষয় বলা যায়—জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মজীবন একরৈখিক নয়। এটি যেমন একজন দীর্ঘ অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তার পেশাগত উত্থানের ইতিহাস, তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের সময়ের ইতিহাস। একই সঙ্গে এটি ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির জটিল সম্পর্কেরও একটি উদাহরণ।একজন সেনাপ্রধানের মূল্যায়নে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তিনি তাঁর দায়িত্বকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখেছেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব প্রতিষ্ঠানকে কতটা দীর্ঘস্থায়ীভাবে বদলেছে। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রশংসা ও সমালোচনা—দুইয়ের বাইরে গিয়ে দলিল, পরিসংখ্যান, সামরিক নথি, সরকারি রেকর্ড, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শী অভিজ্ঞতা একত্র করতে হবে। একজন সাধারণ কর্মকর্তা বা নাগরিকের সিদ্ধান্তের যে প্রভাব সীমিত, একজন সেনাপ্রধানের সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক বড়। তাই একজন সেনাপ্রধানের সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা এবং জনআস্থার প্রশ্নে যে কোনো সেনাপ্রধানের ভূমিকা তাই ইতিহাসের অংশ। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময়ও সেই বৃহত্তর ধারার একটি অধ্যায়। তাঁর কর্মকালকে বিচার করতে হলে তাঁর আগে ও পরে সেনাবাহিনীর পরিবর্তন, জাতীয় নিরাপত্তার বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মযাত্রা বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের একটি বহুমাত্রিক অধ্যায়। বিজিবির মহাপরিচালক থেকে সেনাপ্রধান পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ পথচলায় কমান্ড, প্রশাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, আধুনিকায়ন ও সামরিক কূটনীতির অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর সময়ে Forces Goal 2030-এর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সামরিক যোগাযোগ সক্রিয় থেকেছে।

ইতিহাসের বিচারে কোনো নেতৃত্বই সম্পূর্ণ সাদা বা কালো নয়। ইতিহাস তার নিজস্ব সময়, দলিল এবং ফলাফলের ভিত্তিতে একজন নেতাকে বিচার করে। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের ক্ষেত্রেও সেই বিচারের জন্য প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রয়োজন তথ্য। প্রয়োজন প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্ন করার সাহস এবং সমালোচনার পাশাপাশি অর্জনকে স্বীকার করার ন্যায়বোধ। সুতরাং একজন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মযাত্রাকে এক বাক্যে সফল কিংবা ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করার চেয়ে তাঁকে বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠান, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক কূটনীতির পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে বিচার করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। তাঁর অধ্যায় থেকে যেমন আধুনিকায়ন, পেশাদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার শিক্ষা নেওয়া যায়, তেমনি নেতৃত্বের সঙ্গে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনআস্থার সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত একজন সেনাপ্রধানের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর পদমর্যাদা বা পদক দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তিনি যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সেটিকে কতটা শক্তিশালী, পেশাদার, আধুনিক এবং আস্থাযোগ্য করে রেখে যেতে পেরেছেন তার মাধ্যমে। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের কর্মজীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়নও তাই সময়ের হাতে। তবে তাঁর দীর্ঘ সামরিক পথচলা, সেনাপ্রধান হিসেবে তিন বছরের নেতৃত্ব এবং পরবর্তী বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর অধ্যায় বাংলাদেশের সমকালীন সামরিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গবেষণাযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

তথ্যসূত্র

১. Bangladesh Army — List of Chief of Army Staff, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরকারি ওয়েবসাইট। (Army)
২. The Daily Star — “Lt Gen Aziz made new Army chief”, ১৮ জুন ২০১৮। (The Daily Star)
৩. The Daily Star — “Maj Gen Aziz Ahmed new BGB director general”, ৫ ডিসেম্বর ২০১২। (The Daily Star)
৪. United States Department of State — “Designation of Former Bangladeshi Official for Significant Corruption”, ২০ মে ২০২৪। (U.S. Department of State)
৫. bdnews24.com — “Bangladesh Army chief Gen Aziz meets senior UN officials on US visit”, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১। (bdnews24.com)

 

লেখক :

মোঃ আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা