June 24, 2026, 11:50 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

ধনাগোদা নদী বাঁচলে, বাচবে মতলব!

Reporter Name
ধনাগোদা নদী, মতলব।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। যেখানে সমাজ গঠনে নদীর ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকেই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নদী বাঙালী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই সব নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে বাঙালী সভ্যতার ইতিহাস। দেশের কৃষিকাজ, পানি বিদ্যুৎ, সেচব্যবস্থা, পানিপথে পরিবহন, পানীয় জলের জোগান, মৎস্য উৎপাদন, শহর ও শিল্পকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় পানি সরবারহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে দেশবাসীর জীবনে নদ-নদীর প্রভাব খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালণ করে থাকে। বাংলাদেশের এই নদ-নদীগুলো মায়ের ভালবাসার স্নেহে লালন-পালন করে চলছে আমাদের। দেশের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে নদ-নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর সকল নদীই বিশ্বমানবতার পথিকৃৎ। বিন্দু বিন্দু জলরাশির অববাহিকায় উৎসস্থল পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে ছড়া, নদ-নদী, মহানদী, সমুদ্র, পানিপ্রবাহ ও মহাসাগরের সৃষ্টি। নদী ছড়া উপত্যকার নামেই গ্রাম-শহরের পরিচিত। নদীর সাথে মানুষের আত্মীয়তার বন্ধন চিরকাল। নদী তার জীবন উৎসর্গ করেছে মানুষের কল্যাণে। নদী ইতিহাস রচনা করে। নদীর পানি সর্বধর্ম সর্বজাতির কাছে পবিত্র। নদী নিয়ে কত কথা, রূপকথা, কত গল্প, কবিতা আর গান রচিত হয়েছে কালে কালে,যুগে-যুগে। নদীর পলি থেকে গড়ে উঠেছে শহর, বন্দর, নগর, হাটবাজার, শিল্পকারখানা ও মানবসভ্যতার মূল বিকাশ।

চাঁদপুর জেলাধীন মতলব (উত্তর-দক্ষিণ) উপজেলামা মাঝখান দিয়ে এবং কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার পশ্চিমাংশে বয়ে গেছে একটি ছোট নদী যার নাম ধনাগোদা। একদিন এই প্রানোচ্ছল মৃদু খরস্রোতা নদীটি ছিল মতবের প্রাণ। কিন্তু আজ? আজ মৃতপ্রায় শীর্ণ এক নদীতে রুপান্ত হয়ে গেছে। বর্ষার মৌসুমে যদিও স্বচ্ছ পানি পাওয়া যায় কিন্তু বছরের বাকি সময় সারা নদী জুড়ে কচুরিপানার কারণে পানি পান করা তো দূরের কথা সেচ কাজেও ব্যবহারে যেন অনুপোযুক্ত হয়ে পরে। তখন ধনাগোদা নদীর অধিকাংশ এলাকা জুড়ে আছে কালো, নীলাভ দুর্গন্ধ ও জীবাণুযুক্ত পানি যা  স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই পানিতে নদীর আশেপাশে গড়ে উঠা বাজার এবং মতলব শহরের বর্জ্য ও প্রতিদিনকার বিপুল পরিমাণ মল ও আবর্জনা মিশ্রিত হয়ে থাকে। এই নদীর পানিতে স্থানীয়রা গোসল, কাপড়কাচা, বাসন মাজা আর রান্না-বান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে থাকে। ধনাগোদা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বৈধ-অবৈধ ইটভাটা। যার পোড়া ইট সহ সকল বর্জ্য রাতের অন্ধকারে নদীতে ফেলা হয়।

এছাড়া নদীতে সংযুক্ত খালগুলো দিয়ে আশেপাশের অঞ্চল থেকেও যাবতীয় ময়লা পানি গিয়ে পড়ছে। খালগুলোর অবস্থা যেন আরো এক নরকীয় দৃশ্য!অধিকাংশ এলাকায় খাল ভরাট হয়েছে। এখানে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পানি দুর্গন্ধ। পানিতে ভাসে জবাই করা পশু-পাখির নাড়ি-ভূড়ি সেই সাথে রয়েছে অসংখ্য পলিথিন। কচুরিপানা পচে নদীর গভীরে ডুবে থাকে যার ধরুন বিভিন্ন এলাকার পানিতে সারাক্ষণ বুদবুদ উঠতে দেখা যায়। যার প্রভাবে প্রায়ই মাছ মরে ভেসে ওঠতে দেখা যায়। এখন আর আগের মতো ধনাগোদা নদীতে লঞ্চ ও স্টিমার আসা-যাওয়া করে না। তবে, এরপরও যেগুলো আসা-যাওয়া করে সেসব নৌযান থেকে তেল, ধোঁয়া ও বর্জ্যগুলো অনবরত মিশছে নদীর পানিতে। এছাড়াও ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে নদূতে ফেলা হচ্ছে নানা রকম ময়লা-আবর্জনা। পানির উপর তেলের বিশাল আস্তরণ মাঝে মাঝে খুব স্পষ্টতই দেখা যায়। ইদানিংকালে এসে আধুনিকতা আর বিনোদনের নামে সরাসরি নদীর পানিতে তৈরি হচ্ছে ভাসমান রেস্টুরেন্ট। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জলজ পরিবেশ, পানি ও মৎস বাস্তুসংস্থানের উপর। এরপর রয়েছে, নদীর পাড় ও চর দখল করে বালুর ব্যবসা। সেসব বালু আবার বৃষ্টি সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে গিয়ে পড়ছে নদীতে। যাতে করে নদীর পানি ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে এসব বালুর কারণে নদীতে চর পরে নদীর নাব্যতা সৃষ্টি হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিন নানাভাবে দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে পড়ছে ধনাগোদা নদীর পানি ও পরিবেশ। নদীর তীরের বসতিপূর্ণ এলাকায় উন্মুক্ত পায়খানার মল ফেলা হচ্ছে পানিতে। যার ফলে এই নদীর পানি ব্যবহার মোটেই নিরাপদ নয়।

এসব বর্জ্যে ক্ষতিকর আর্সেনিকও রয়েছে। ক্ষতিকর আর্সেনিক পলির সঙ্গে জমা হচ্ছে। প্রতিদিন এমব বর্জ্য পানিতে পড়ার ফলে নদী পানি বিষাক্ত হচ্ছে। পলিথিনের কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীর তলদেশ, যার প্রভাবে দেশী মাছের উৎপাদন করে গেছে এবং বিলুপ্তের পথে বহু মাছ। ফলে শুধু পানিই বিষাক্ত হচ্ছে না ইতোমধ্যে মাছও নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। ধনাগোদা নদীতে আগের মতো আর স্বাধু পানির মজাদার মাছ পাওয়া যায় না।

এছাড়াও ধনাগোদা নদীর তীরে রয়েছে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল। এইসব হাসপাতালের জীবাণুযুক্ত যাবতীয় পানি ও বর্জ্য ড্রেন দিয়ে ধনাগোদা পড়ছে। তাছাড়া, হাসপাতালের রোগীদের ব্যবহৃত পোশাক, বিছানার চাদর ও যাবতীয় কিছুও ধোয়া পানি ড্রেনের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে নদীতে। ফলে নানান জটিল রোগের জীবাণু মিশছে ধনাগোদা নদীর পানিতে। ধনাগোদা নদীর দু’পাড়ে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন বহু মানুষজন বাস করে যারা এই নদীর পানিতে গোসল সহ সকল কাজকর্ম করে থাকে। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার নারী-পুরুষ গোসল করে। কাপড় কাচা থেকে হাঁড়ি-কুঁড়ি ধোয়া-মাজা পর্যন্ত। এছাড়া নদীর পাড়ে থাকা বাজার সমূহের স্থানীয় সব হোটেলগুলোতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও হাতমুখ ধোয়ার জন্য নদীর পানি ব্যবহার করা হয়।

পরিবেশ সচেতণ ব্যক্তিগণ আশংকা করছেন যে, এক সময়কার খরস্রোতা ধনাগোদা নদীটি ক্রমাগত দূষিত হয়ে পড়ছে। অথচ, দূষণ নিয়ন্ত্রণের যেমন উদ্যোগ নেই, তেমনি দূষণ কী হারে বাড়ছে তারও পর্যবেক্ষণ নেই। শুকনো মৌসুমে নদীতে থাকা কচুরিপানা পচার কারণে পানি ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে বলে তারা মতামত ব্যক্ত করেছেন। ধনাগোদা নদীকে দূষণমুক্ত রাখা স্থানীয় নাগরিক জীবনের সাংবিধানিক মৌলিক কর্তব্য।

ইতিহাস বলে, চিরকাল নদীর তীরে মৎস্যজীবী পেশার মানুষগুলো বসবাস করে আসছে। তাদের দৈনন্দিন নদীতে মাছ শিকার প্রধান জীবিকা। ধনাগোদার দু’কূলেও তার ব্যতিক্রম নয়। এই নদীর দু’পাড়ে এখনও বহু জেলে পল্লী রয়েছে। যারা বর্তমানে নদীতে দেশীয় মাছের অভাবে ও শুকনো মৌসুমে নদীতে কচুরিপানা ভরে থাকার কারণে অন্য পেশার যেতে বাধ্য হচ্ছেন এবং চলে যাচ্ছেন। যা এই অঞ্চলের মৎস আহরণের জন্য হুমকী স্বরুপ। অদূর ভবিষ্যতে এই পেশায় আর হয়ত কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমাদের এই সবুজ ধরণীর বুকে নদী চিরকাল বয়ে যাবে আপন ধারায়। নদীর প্রতি মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে উঠেছে প্রাচীনকাল থেকে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য হ্রাসের ফলে আমাদের মতলবের ধনাগোদা নদীটি দিন-দিন হারিয়ে ফেলছে তার নাব্যতা আর অপার সৌন্দর্য।

নদী পরিবেশের বিশেষ অঙ্গ, মানুষের কাছে নদীর গুরুত্ব তাই অপরিসীম। নদী দূষণ সম্পর্কে মানুষের অবচেতনার ফলে নদীর বালুচরে এখনও খোলা আকাশের নিচে মুক্ত পায়খানা, নদীতে ভাসমান মৃত গবাদি পশুর দেহ মাটিতে পুঁতে না-দিয়ে নদীর পানি ফেলে দেওয়ার রীতি রয়েছে। সম্প্রতি পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা বুদ্ধির সুবাদে নদীতে মুক্ত পায়খানা করার কুঅভ্যাস অনেকাংশে কমে গেছে। নদী নাগরিক জীবনের সম্পদ হিসেবে প্রদান করছে মুক্ত পানি, বিদ্যুৎ, সেচ, নদীর বালু-পাথর, মৎস্যজাতীয় সুষম খাদ্য। নদীর চরে সবুজ ফসল, শাকসবজি।

আগে শীতের মৌসুমে পাহাড়িরা নদীতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক বিষ প্রয়োগ করত। এক জাতীয় বিষাক্ত লতার রস নদীর পানিতে মিশিয়ে দিত। এতে কিছু সময়ের জন্য মাছের চোখ অন্ধকার হয়ে যেত। শত শত মানুষ আনন্দে উল্লাসে নদীতে মাছ ধরার জন্য দল বেঁধে নেমে পড়ত। এখানও নদীর পানিতে কিছু অসাধূ মানুষকে বিষ মিশিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়। যার ফলে নদীর কোলে প্রকৃতিতে উৎপন্ন ছোটো বড়ো মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক, শামুক, কচ্ছপ, ব্যাঙ প্রভৃতি জলজ প্রাণী বংশানুক্রমে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে মৎস্যজীবীরা সমূলে বিপন্ন হচ্ছে। ঔষধিসম্পন্ন বহু মাছ আজকাল নদীতে দু®প্রাপ্য। নদীতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। নদীতে বিষ প্রয়োগের চরম প্রবণতায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী জীবাণুরা বিলুপ্ত হতে চলেছে। রাসায়নিক বিষ কৃষকের জমিতে ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ রোধ করার জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে। নদী চিরকাল মানুষের সুখ-দুঃখের সাক্ষী। নদী মানব সভ্যতার দিশারী বলেই মানুষ নদীর কাছে ঋণী। নদীতে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞায় সরকার অনতিবিলম্বে আইন প্রণয়ন করা উচিত বলে মনে করি। তাই আসুন এখনও সময় আছে আমরা দল-মত ভুলে সমগ্র মতলববাসী ঐক্যমত গড়ে তুলে প্রিয় ধনাগোদা নদী বাচাতে আওয়াজ তুলি। না হলে, সেদিন দূরে নয়, যখন এই নদীটি আমাদের কাছে শুধুমাত্র স্মৃতি হয়ে থাকবে। ধনাগোদা নদী বাচলে, বাচবে মতলব! ফলবে ফসল-হাসবে সবাই।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারি

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা