June 24, 2026, 9:30 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

পরকিয়া : নৈতিকতার অবক্ষয়

Reporter Name

মানবসভ্যতার ইতিহাসে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি সামাজিক কাঠামো নয়, বরং মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম একক হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একজন মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার শিক্ষা অনেকাংশে পরিবার থেকেই শুরু হয়। আর সেই পরিবারের অন্যতম ভিত্তি হলো দাম্পত্য সম্পর্ক—যেখানে বিশ্বাস, ভালোবাসা, আস্থা এবং পারস্পরিক সম্মান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু আধুনিক সময়ের নানা সামাজিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বিস্তার এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সেই দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর সবচেয়ে বড় যে আঘাতটি এসেছে, তা হলো পরকিয়া।

পরকিয়া মূলত এমন একটি সম্পর্ক, যা বিবাহিত জীবনের বাইরে গোপনে বা প্রকাশ্যে অন্য কারও সঙ্গে আবেগিক বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং এটি পরিবার, সমাজ এবং নৈতিকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। কারণ একটি দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। আর যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন শুধু দুটি মানুষের সম্পর্কই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সন্তান, পরিবার এবং সামাজিক কাঠামোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের জীবনে ভালোবাসা একটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় অনুভূতি। কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা আর নির্মল থাকে না। বরং তা ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে। পরকিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তেমনই। প্রথমে এটি হয়তো একটি সাধারণ পরিচয় বা বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়, তারপর ধীরে ধীরে আবেগিক নির্ভরতা তৈরি হয় এবং একসময় তা দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে একটি গোপন সম্পর্কের রূপ নেয়।

আজকের সমাজে পরকিয়ার প্রসঙ্গ আগের তুলনায় অনেক বেশি আলোচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল প্রযুক্তি এবং ভার্চুয়াল যোগাযোগের সহজলভ্যতা মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ধরনকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে মানুষের যোগাযোগ সীমিত ছিল, এখন সেখানে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। এই সহজ যোগাযোগ যেমন অনেক ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তা দাম্পত্য জীবনের জন্য নতুন ধরনের সংকটও তৈরি করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো এড়িয়ে গিয়ে ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় খোঁজে। সেখানে নতুন সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে পরকিয়া সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই সম্পর্কগুলো অনেক সময় আবেগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, যেখানে বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে। ফলে মানুষ সাময়িকভাবে একটি ভিন্ন ধরনের আনন্দ বা উত্তেজনা অনুভব করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

পরকিয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত নৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সমস্যাও। কারণ যখন একটি পরিবার ভেঙে যায়, তখন তার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই পরিবারের সন্তানরাও গভীর মানসিক আঘাতের শিকার হয়। তারা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে—কারণ তাদের কাছে পরিবার মানেই ছিল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। কিন্তু যখন তারা দেখে সেই পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, তখন তাদের মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে দাম্পত্য দ্বন্দ্ব বা বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটে, সেই পরিবারের সন্তানরা মানসিকভাবে বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে অনিরাপত্তা, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে তাদের নিজস্ব সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলতে পারে।

পরকিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নৈতিক প্রভাব। সমাজে যখন পরকিয়া সম্পর্ককে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়, তখন ধীরে ধীরে মানুষের নৈতিক মানদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় চলচ্চিত্র, নাটক বা সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্টে পরকিয়াকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কিছু মানুষের কাছে এটি একটি স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—পরকিয়া কখনোই কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং এটি নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। যদি কোনো দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা থাকে, তাহলে তার সমাধান হওয়া উচিত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে, বোঝাপড়ার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে পারিবারিক বা সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে। কিন্তু গোপন সম্পর্ক তৈরি করা সেই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরকিয়া একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ পরিবারকে একটি পবিত্র বন্ধন হিসেবে দেখা হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব এবং বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্বাস ভঙ্গ করা শুধু ব্যক্তিগত ভুল নয়; বরং এটি সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধেরও লঙ্ঘন। তবে পরকিয়ার প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত চরিত্রের দুর্বলতার কারণে ঘটে না। অনেক সময় দাম্পত্য জীবনের নানা সমস্যা, যোগাযোগের অভাব, পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি কিংবা মানসিক দূরত্ব থেকেও এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই সমস্যার মূল কারণগুলো বোঝার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দাম্পত্য জীবনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একে অপরের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ব্যস্ততা, পেশাগত চাপ বা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তারা একে অপরের অনুভূতির প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে। তখন কোনো তৃতীয় ব্যক্তি যদি সেই শূন্যতা পূরণ করার মতো আচরণ করে, তাহলে আবেগিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। যদিও এটি কোনোভাবেই পরকিয়ার নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করে না, তবে সমস্যার বাস্তব কারণগুলো বুঝতে সাহায্য করে।

সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে হলে পরিবারকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার যদি ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে অনেক সমস্যাই সহজে সমাধান করা সম্ভব। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা, একে অপরের প্রতি সম্মান এবং দায়িত্ববোধ দাম্পত্য সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় করে তোলে। একই সঙ্গে সমাজের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে—সাময়িক আবেগ বা আকর্ষণ জীবনের স্থায়ী সুখ এনে দিতে পারে না। বরং স্থায়ী সুখ আসে দায়িত্ব, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।

পরকিয়া বিষয়টি নিয়ে অনেক সময় সমাজে দ্বিমুখী আচরণ দেখা যায়। একদিকে মানুষ এটিকে নৈতিকভাবে ভুল বলে মনে করে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে আবার এটি নিয়ে কৌতূহল বা গোপন আগ্রহও দেখা যায়। এই দ্বৈত মনোভাব সমাজে একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন—যাতে মানুষ বুঝতে পারে এর বাস্তব পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, পরকিয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক ও সামাজিক সংকট। এটি পরিবারকে দুর্বল করে, সন্তানদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এই সমস্যাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে সামাজিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানুষ ভুল করতে পারে—এটি মানবস্বভাবের অংশ। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াও মানুষের দায়িত্ব। দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষা করা শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। কারণ একটি সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের ভিত্তি।

সুতরাং, পরকিয়া কখনোই কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং এটি নৈতিকতার অবক্ষয়ের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। সমাজ যদি সত্যিই সুস্থ ও স্থিতিশীল হতে চায়, তাহলে পরিবারকে শক্তিশালী করতে হবে, দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি সম্মান বাড়াতে হবে এবং নৈতিক মূল্যবোধকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা