সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত, বাহিনীর ইমেজ ক্ষুন্ন করে, অভ্যন্তরীণ ভীতি ছড়িয়ে নিরাপত্তা কাঠামো ভাঙার গোপন কৌশল বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১০ জন অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো গুরুতর ক্ষমতার অপব্যবহার, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ ও বিদেশে অর্থ পাচার। স্বাভাবিকভাবেই, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এ অভিযান কি সত্যিই দুর্নীতিবিরোধী, না কি এটি একটি বড় পরিকল্পনার অংশ, যেখানে বাহিনীর অভ্যন্তরে ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিয়ে নিরাপত্তা কাঠামোকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চলছে?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এ তদন্তের মাধ্যমে স্বাধীনচেতা ও দেশপ্রেমিক সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করে রাষ্ট্রের ভিতরেই এক ধরনের ভীতি ও অনাস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে করে শুধু বাহিনীর মনোবলই ভেঙে পড়ছে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করা একটি সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ এক সূক্ষ্ম কৌশল বাহিনীর ভেতরে বিভ্রান্তি, ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে দ্বিধা এবং গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক নেতৃত্বকে বিতর্কিত করে একটি বিশেষ আদর্শিক গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করা।
বাহিনী প্রধানগণ, সাবেক ডিজি ডিজিএফআই, ডিজি এনএসআই, ডিজি এসএসএফ, ডিজি এনটিএমসি, বিজিবির সাবেক মহাপরিচালকরা এবং রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান সহ অনেক জেনারেলদের বিরুদ্ধে নাকি অনুসন্ধান চলছে এবং অনেকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে।
দুদক বলছে, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, জিজ্ঞাসাবাদ, ব্যাংক হিসাব জব্দসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেনের দাবি “নিয়মতান্ত্রিক তদন্ত চলছে, প্রমাণ মিললেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু দুদক যা করছে তাকি সঠিক? তদন্তই যেখানে শেষ হয়নাই অনেকের বিরুদ্ধে, মামলা দায়ের, বিচার কার্য পরিচালনা করে এবং অপরাধ প্রমান করার আগেই অনেককে দুদক দুর্নীতিবাজের তকমা দিয়ে দিচ্ছেন, কাদের ইশারায়? কি উদ্দেশ্যে??
জনমনে প্রশ্ন উঠছে এই তদন্তগুলো এমন এক সময়ে কেন শুরু হলো, যখন দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র এবং আদর্শিক দ্বন্দ্ব গভীর? যেসব কর্মকর্তারা জঙ্গিবাদ দমন, চরমপন্থা মোকাবেলা, এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন তাদের হঠাৎ করে এইভাবে অভিযুক্ত করা নেপথ্যে একটি মতাদর্শিক ও রাষ্ট্রীয় চাপের ছায়া স্পষ্ট করছে। এতে করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, বরং একটি ‘পছন্দসই বাহিনী’ গঠনের লক্ষ্যে আগের প্রজন্মের দেশপ্রেমিক ও দৃঢ় কর্মকর্তাদের দমন করার অপচেষ্টা বলেই ধারণা করছেন অনেকেই।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দুর্নীতির তদন্ত চলবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তদন্ত যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, আগে থেকেই অভিযুক্তদের সম্মানহানি হয়, এবং সেটি যদি একটি গোটা নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আঘাত হানে—তবে তা কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির ভুল প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষ করে, যেসব কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে জঙ্গিবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আজ যদি তারাই বিতর্কিত হয়ে পড়েন তবে এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও বাহিনীর মনোবলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। রাষ্ট্র নিজেই যেন তার বাহিনীর আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণ করতে চায় এমন ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে জনমনে।
বাংলাদেশ বর্তমানে রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকটের এক ক্রান্তিকালে অবস্থান করছে। এ সময় সাবেক সামরিক নেতৃত্বকে ঘিরে এভাবে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন ও তদন্ত চালানো দেশের নিরাপত্তা কাঠামো, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। বাহিনীর ইমেজ ক্ষুন্ন করে, অভ্যন্তরীণ ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে সাময়িক সুবিধা হয়তো অর্জন করা যাবে, কিন্তু এতে জাতি হারাবে তার অভ্যন্তরীণ শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রাষ্ট্রনিষ্ঠ, দক্ষ ও সাহসী নেতৃত্ব।