বারো মাসে তেরো পার্বণ,তেরো পার্বণের একটি পার্বণ নবান্ন। অগ্রহায়ণ মাসের ৩ তারিখে বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই দিনে নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে। দেশের সকল ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এই নবান্ন উৎসব একটি সার্বজনীন উৎসব।
রবিবার (১৭নভেম্বর) বগুড়ার শিবগঞ্জে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে বসেছে হরেক রকম মাছের মেলা।
নবান্ন উপলক্ষে উথলী বাজারে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বড় বড় বিভিন্ন রকমের মাছের পসরা সাজিয়ে একদিনের জন্য বসেছে ঐতিহাসিক এই মাছের মেলা বসে।
নবান্ন শস্যভিত্তিক একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রমীন শস্যোৎসব। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গ্রামবাংলার কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। দেশের সব ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এ উৎসব একটি সার্বজনীন উৎসব। বাংলা মাসের ৩ অগ্রাহায়ণ বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই দিনে নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে।
অগ্রহায়ণ মানে নতুন ধান ঘরে তোলার শুভক্ষণ । অনেকে এই মাসকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘আগোন’ মাস বলে থাকেন। গ্রামবাংলায় দাদু ঠাকুমারা এ মাসকে আগোন মাস বা ধান কাটার মাস বলেন। অগ্রহায়ণ মাসে মূলত নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। নবান্ন অর্থ নতুন অন্ন। আমন ধান কেটে নতুন অন্ন ঘরে তোলাকেই নবান্ন বলা হয়ে থাকে। দেশের অনেক জেলাতে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে এই নবান্ন উৎসব। শুধু তাই নয় অগ্রহায়ণকে আমরা সোনার অগ্রহায়ণ মাস বলেও জানি। অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধানকে সোনার সাথে তুলনা করা হয়েছে। ধান কেটে চাল প্রস্তুত করে সেই চাল দিয়ে রান্না করা হয় গুড়ের পায়েস অথবা ক্ষীর। আত্মীয়-স্বজনদের বা প্রতিবেশীদের একে অপরের আতিথেয়তা রক্ষা করা হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদার বুৎসিংহের কাছে স্থানীয় প্রজারা দাবি করেন হাট স্থাপনের। প্রজাদের আবদার শুনে জমিদার সেই সময় প্রায় ৫২ বিঘা জমি হাটের জন্য দান করেন। সেই থেকে বাংলা বছরের অগ্রহায়ণের উথলী বাজারে নবান্ন মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
নবান্ন উৎসবকে ঘিরে উথলী, রথবাড়ী, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদুল্লাপুর, বেড়াবালা, আকনপাড়া, গরীবপুর, দেবীপুর, গুজিয়া, মেদেনীপাড়া, বাকশন, গণেশপুর, রহবল শিবগঞ্জসহ প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ সহ পাশাপাশি উপজেলা এবং জেলা থেকেও মাছ কেনার জন্য উথলী বাজারে ভিড় জমায়।
ঐতিহ্য ও রীতিনীতি অনুযায়ী মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণ করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে উৎসবের আমেজে বাংলার কৃষকের ও মাটির গন্ধ খুঁজে পায়।
সরেজমিন দেখা যায়, ভোরবেলা থেকে মেলায় বড় বড় মাছ নিয়ে হাজির হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দুই শতাধিক দোকানে দুই থেকে শুরু করে ১৫/২০ কেজি ওজনের বাঘাইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, সিলভার কার্প, ব্রিগেড কার্প, ব্লাড কার্পসহ নানা রকমের মাছ বিক্রি হচ্ছে।
মেলায় বাঘাইড় ১৫০০ টাকা কেজি, বোয়াল ১৪০০ টাকা কেজি, রুই, কাতলা ও চিতল মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও মাঝারি আকারের মাছ ৩০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ৩০০-৫০০ টাকা দরে ব্রিগেড ও সিলভার কার্প মাছ বিক্রি করতে দেখা গেছে।
নবান্নের মেলার মূল আকর্ষণ হলো মাছ সেই সাথে নতুন আলু,কেশর,মিষ্টি আলু, নতুন শাকসবজি ও তরকারি। এছাড়া মেলায় বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি, রসমালাই,জিলাপি, দইসহ খাবারের দোকান বসে। পাশাপাশি মাটির বাসন,মাটির খেলনা সহ ছোট বাচ্চাদের খেলনার দোকান নিয়ে হাজির হন মেলা প্রেমিক দোকানিরা।
উথলী গ্রামের শিক্ষক রনি বলেন, মেলাটি অনেক পুরনো। মেলাকে ঘিরে আশেপাশের লোকজন প্রায় কয়েক মাস আগে থেকে আর্থিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে কেনাকাটা করার জন্য। মেলায় মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেয়া হয়। প্রতিটি বাড়িতেই মেহমান দিয়ে ভরপুর থাকে। একেকটি পরিবারের এ মেলায় মোটা অংকের টাকা খরচ করতে হয়। যার বাড়িতে যেমন মেহমান আসে, তার বাড়িতে তেমন খরচ হয়।
তাপস সরকার নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, তার বাড়িতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন আত্মীয় এসেছেন। আরও আসার কথা আছে । তিনি ৪ কেজি ওজনের সিলভার কার্প মাছ কিনেছেন। নতুন আলু শাক সবজি তরকারি সহ মিষ্টি দই ও রসমালাই,চিড়া,মুড়ি কিনেছেন।
সংসার দিঘী প্রবীণ ব্যক্তি রবিন ইসলাম স্মৃতি চারণ করে বলেন, ছোটবেলায় অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার মসজিদে যাওয়া কোনোভাবেই মিস করিনি। কারণ নবান্ন উৎসবে গ্রামের অনেক মানুষই মসজিদে ক্ষির দিতো। নামাজ শেষে মসজিদের উঠানেই কলাপাতায় করে চেটেপুটে খেতাম। তবে এখন তা আর দেখা যায় না। কালের পরিক্রমায় তা আজ হারাতে বসেছে।
মাছ ব্যবসায়ী সজল বলেন, তিনি ২ লাখ টাকার মাছ এনেছেন। গতবারের তুলনায় এবার মাছের দাম একটু বেশি। তবুও বিক্রি বেশ ভালো হচ্ছে।
মাছ বিক্রেতা আমতলী গ্রামের আব্দুল বাকী জানান, মেলায় ছোট-বড় মিলে দুইশতাধিক মাছের দোকান বসেছে। প্রত্যেক বিক্রেতা অন্তত ৫ থেকে ১০ মণ করে মাছ বিক্রি করেছেন। মেলায় মাছ সরবরাহের জন্য সেখানে রাত থেকে ২০/২৫ টি আড়ৎ খোলা হয়। সেসব আড়ৎ থেকে স্থানীয় বিক্রেতারা পাইকারি দরে মাছ কিনে মেলায় খুচরা শবিক্রি করেন।
শিবগঞ্জ প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম বলেন, অনেক বছরের পুরনো এই মেলায় সূর্যোদয়ের পর থেকে রাত পর্যন্ত মাছ কেনাবেচা হবে। এবার মাছের আমদানি ভালো। আশা করি এ বছর এখানে কোটি টাকার ওপরে মাছ কেনাবেচা হবে।
শিবগঞ্জ উথলি হাটের ইজারাদার মঞ্জুরুল হক মঞ্জু বাতায়ন 24নিউজ-কে বলেন, বাংলার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে প্রতিবছর সুষ্ঠুভাবে নবান্ন উপলক্ষে একদিনের এই মেলা হয়ে আসছে। আগে মেলাটি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও গত ৪০ বছর ধরে বড় পরিসরে হচ্ছে। শুধু আশপাশের গ্রামের নয়, পুরো বগুড়া জেলার মানুষ এখানে নবান্নের বাজার করতে আসেন এ মেলায়।