বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের যে ঘটনাবলি সমাজকে বিস্মিত ও ব্যথিত করেছে, তার অন্যতম হলো শিক্ষক লাঞ্ছনা। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। সমাজে যখন নৈতিক মান ভেঙে পড়ে, তখন যে বিশৃঙ্খলা জন্ম নেয় তার প্রথম শিকার হয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, আর সেই জগতে সবচেয়ে অবহেলিত হন শিক্ষক। অথচ এই মানুষগুলোই একদিন আমাদের হাতে অক্ষর তুলে দিয়েছেন, শিখিয়েছেন চিন্তা করতে, যুক্তি করতে, মূল্যবোধ ধারণ করতে। তারা শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন সারাজীবন। কিন্তু সেই মানুষটিই আজ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষকরা কি মানুষ গড়তে ব্যর্থ হয়েছেন? নাকি সমাজই মানুষ হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে?
যে দেশে শিক্ষককে কেন্দ্র করে একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সম্মানের অদৃশ্য আভা বিরাজ করত, আজ সেখানে ভয়, অবমাননা ও অপমানের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। রাজনীতির দহনে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেখানে শিক্ষক নিজের পরিচয়ের নিরাপত্তা হারিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রী যারা একসময় সাইকেলে চড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করতেন, তারা আজ ক্ষমতার দাপটে তাদের শিক্ষকের গায়ের শার্ট ধরে টেনে নামায়। শিক্ষক হঠাৎ কোনো শত্রুতে পরিণত হননি; বরং সমাজের অভ্যন্তরের নীতিহীনতার বিষাক্ত রূপই তার ওপর এসে পড়েছে।
শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়, তার মতাদর্শ, তার সামাজিক অবস্থান—এসব কিছু আজ তার শিক্ষকের পরিচয়ের ওপরে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে তার আদর্শ দিয়ে, তার অবস্থান দিয়ে, তার চিন্তা দিয়ে। কিন্তু তাকে শিক্ষক হিসেবে দেখার নজর হারিয়ে গেছে। যে নজর একসময় শ্রদ্ধাভরে ঝুঁকে পড়ত, আজ তা তাচ্ছিল্যে উপেক্ষা করে। শিক্ষককে আর জ্ঞানের প্রতীক মনে করা হয় না; তাকে বহন করতে হয় শত্রু ভাবনার বোঝা।
বাংলাদেশের নানা প্রান্তে যে ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর বয়ান এক করার সাহসও কারও নেই। কারণ শিক্ষক লাঞ্ছনা যেন এখন একটি সাধারণ সংবাদ। প্রিন্সিপালকে চুল ধরে টানা হচ্ছে, সহকারী শিক্ষককে কলার ধরে টেনে বের করা হচ্ছে, নারী শিক্ষিকাকে সম্মানহানি করা হচ্ছে, অধ্যাপককে অপমান করে ইচ্ছামতো ক্ষমতার প্রদর্শনী চালানো হচ্ছে। কিছু ছাত্র গর্ব করে বলে—“স্যারকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।” এই ভয়ংকর কথাটি যে শুধু একজন শিক্ষক নয়, গোটা জাতির ভবিষ্যতের ওপর আঘাত—তা কেউ ভাবছে না।
শিক্ষক লাঞ্ছনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনের মতো এমন ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে ছাত্ররা অহংকার নিয়ে শিক্ষককে হেনস্তা করছে। কারও আঙুল শিক্ষককে নির্দেশ করছে, কারও মুখে অবমাননার তীব্র শব্দ, কারও হাতে আছে শারীরিক আক্রমণের প্রস্তুতি। প্রশ্ন হলো—এরা কি শিক্ষকজন্মের ফসল? তারা কি কখনো মূল্যবোধ শেখেনি? শিক্ষকরা কি মানুষ গড়তে পারেননি? নাকি সমাজই তাদের মানুষ হতে দেয়নি?
বাস্তবতা হলো—শিক্ষক যতই চেষ্টা করুন, সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি বিপরীতমুখী থাকে, তবে ছাত্র মানুষ হবে কীভাবে? শিক্ষক একটি বীজ বপন করেন; কিন্তু সেই বীজ বেড়ে উঠতে মাটি, পানি, আলো, পরিবেশ লাগে। আজকের সমাজ সেই পরিবেশটিই কেড়ে নিয়েছে। পরিবারে মূল্যবোধের পাঠ হারিয়ে গেছে; নৈতিকতা শেখার জায়গায় এসেছে অন্ধ প্রতিযোগিতা; রাজনীতিতে আদর্শের জায়গা দখল করেছে অন্ধ আনুগত্য; সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্তির জায়গায় এসেছে উত্তেজনা। যেসব ছাত্র শিক্ষককে অপমান করছে, তাদের তৈরি করেছে এই সমাজ, শিক্ষক নয়। তাই শিক্ষক ব্যর্থ হননি, বরং সমাজই ব্যর্থ হয়েছে মানুষ তৈরি করতে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নির্মমতা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। আজ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে শিক্ষক জ্ঞানের উৎস নয়; তারা মনে করে জ্ঞান আসে গুগল থেকে, ভিডিও থেকে, শর্টকাট পাঠ থেকে। যখন শিক্ষক তার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি ধারণা বোঝাতে চান, তখন ছাত্র মনে করে—“স্যার তো আপডেট না।” এ এক ভয়াবহ সময়, যেখানে জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, অভিজ্ঞতার প্রতি কৃতজ্ঞতা নেই। ছাত্রের চোখে শিক্ষক আর পথপ্রদর্শক নন, বরং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী এক চরিত্র—এই ধারণা সমাজ তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় শিক্ষকরা সবসময়ই ছিলেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক শিক্ষককে অপমান করা হয়েছে এই অভিযোগে যে তিনি ‘ওই দলের লোক’। এই সংকীর্ণ মানসিকতা সবচেয়ে বড় নৈতিক অধঃপতনের পরিচয়। শিক্ষক কোনো দলের লোক নন—তিনি জাতির সম্পদ। তাকে দলীয় ঘরে আটকে দেওয়ার মানে পুরো জাতিকেই একটি দলে বন্দি করা। শিক্ষককে দলের পরিচয়ে বিচার করা মানে জ্ঞানের মৌলিক পরিচয়ে আঘাত করা।
এখন প্রশ্ন—এ অবস্থা পরিবর্তন কীভাবে হবে? সমাধান কোথায়?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট এখন মূল্যবোধের সংকট। আমরা আজ জানতে চাই—শিক্ষক কি পারলেন মানুষ গড়তে? কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি—মানুষ গড়ার দায়িত্ব শুধু শিক্ষক একার নয়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র—সবাই মিলে মানুষ গঠন করে। কিন্তু পরিবার এখন ব্যস্ত প্রতিযোগিতায়, সমাজ ব্যস্ত প্রদর্শনীতে, রাষ্ট্র ব্যস্ত ক্ষমতার রাজনীতিতে। সেখানে শিক্ষক একা লড়ে যাচ্ছেন। তাই ছাত্র যদি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়, যদি অমানবিক হয়, যদি দায়িত্বহীন হয়—দোষ শুধু শিক্ষকের নয়, পুরো সমাজের।
শিক্ষক হতে গেলে একটি মানুষকে নৈতিকতার পরীক্ষায় বারবার উত্তীর্ণ হতে হয়। কিন্তু ছাত্র হতে গেলে শুধু একটি স্কুল-কলেজে ভর্তি হলেই হয়।
এই অসম সমীকরণেই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। শিক্ষক তার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেন, কিন্তু ছাত্র যদি সমাজের আক্রমণাত্মক সংস্কৃতির শিকার হয়, তবে সেই ছাত্রকে শিক্ষক একা সামলাতে পারেন না। আর যখন শিক্ষকই নিজে নিরাপত্তাহীন, তখন তিনি আর কীভাবে মূল্যবোধ শেখাবেন? শিক্ষক লাঞ্ছনা শুধু কয়েকজন শিক্ষকের অপমান নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক মৃত্যুর ঘোষণা। জ্ঞানকে যখন সম্মান করা হয় না, তখন সেই জাতি কখনোই উন্নত হতে পারে না। যে ছাত্র আজ তার শিক্ষককে টেনে বের করছে, সে আগামীকাল অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দিতে পারে। সে কোনোদিন একজন সৎ কর্মকর্তা হতে পারে না, একজন নীতি-নিষ্ঠ বিচারক হতে পারে না, একজন মানবিক ডাক্তার হতে পারে না। শিক্ষককে অসম্মান করার মধ্য দিয়ে সে নিজ ভবিষ্যৎকেই অন্ধকার করছে।
আজ প্রয়োজন একটি জাতীয় পুনর্জাগরণ—যেখানে শিক্ষককে পুনরায় মূল্যবোধের কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনা হবে। যেদিন আমরা শিক্ষককে সম্মান দিতে শিখব, সেদিন ছাত্রও মানুষ হবে। শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিটি ঘটনার বিচার করতে হবে কঠোরভাবে, আইনকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে শিক্ষক-সম্মানের পাশে। পরিবারগুলোকে মূল্যবোধ শেখাতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরিত্র শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে শিক্ষককে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। একটি দেশ তখনই সভ্য হয়, যখন তার শিক্ষকেরা নিরাপদ থাকে। কারণ শিক্ষক একটি জাতির দিকনির্দেশক। তাদের হাতে ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। সেই হাতেই যখন সমাজ আঘাত করে, তখন ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়ে। আজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সেই ভাঙনের কিনারায় দাঁড়িয়ে। আর এই ভাঙন থামাতে হলে প্রথম শর্ত—শিক্ষককে তার সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া।
তাই প্রশ্নটি আজ আবারও ফিরে আসে—শিক্ষকরা কি মানুষ গড়তে পেরেছেন?
উত্তরটি সহজ নয়। শিক্ষকরা চেষ্টা করেছেন, সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সমাজ, রাজনীতি, পরিবার—তারা কি শিক্ষককে মানুষ গড়ার সুযোগ দিয়েছে?
যে সমাজ শিক্ষককে সম্মান দেয় না, সেই সমাজে মানুষ গড়ে না। মানুষ গড়ার দাবি আমরা করতে পারি—কিন্তু তার আগে আমাদের শিখতে হবে মানুষ হওয়া। যেদিন শিক্ষককে আমরা আবার তার স্বাভাবিক মর্যাদায় দেখতে শিখব, সেদিনই মানুষ গড়ার কাজটি সত্যিকারে সফল হবে। শিক্ষককে অপমান করে যে জাতি মানুষ হওয়ার অধিকার হারিয়েছে—সেই জাতিকে মানুষ বানানোর জন্যই শিক্ষক আজও লড়ে যাচ্ছেন।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।