ধনাগোদা নদী—মতলব উত্তর ও দক্ষিণের মাঝ বয়ে যাওয়া একটি সরল নদীপথ, কিন্তু তার অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। নদীটি শুধু জলধারা নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, খাদ্য, পরিবহন, প্রাকৃতিক সম্পদ—সবকিছুকে এক সুতোয় গাঁথা। অথচ সেই নদীটিই আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। কয়েক মাস ধরে ধনাগোদার অবস্থা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার; সেই অভিজ্ঞতাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—একটি নদীকে হত্যা করা কত সহজ, কিন্তু একটি নদীকে বাঁচানো কত অসীম কঠিন।
নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটারজুড়ে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা কোনো ভাবেই নদীর স্বাভাবিক চিত্র নয়। বরং মনে হয়, একটি জীবন্ত জলধারাকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। দু’পাড় জুড়ে এবং মাঝনদী পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে বসানো বাঁশের অগণিত বেড়া নদীর বুক চিরে এগিয়ে গেছে। প্রতিটি বেড়ায় ঝুলছে সূক্ষ্ম জাল, যা পানির উপরিভাগ থেকে তলদেশ পর্যন্ত নেমে গিয়ে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য কারাগার—যেখানে ছোট মাছ, বড় মাছ, এমনকি ডিমওয়ালা মা-মাছও আটকা পড়ে নির্বিচারে নিধন হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে যে প্রথম ধারণাটি আমার মনে এসেছিল, তা হলো—এ যেন কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন মাছের খামার। অথচ এটি কোনো ব্যক্তির নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক নদী, যা হাজারো জীবনের। কিন্তু বাস্তবে নদীটি আর নদী নেই; বরং প্রভাবশালীদের হাতে বন্দী এক জলাশয়, যার ওপর পাঁচ–দশজন মানুষের একচ্ছত্র দাপট।
উপজেলার কালীপুর, সিপাই কান্দি, আমিরাবাদ, নন্দলালপুর, কালীরবাজার, নায়েরগাঁও, বাইশপুর—এভাবে দুই উপজেলার প্রায় ৩০টি পয়েন্টে ছড়িয়ে রয়েছে ৬০০-রও বেশি বাঁশের বেড়া। সংখ্যাটা শোনার মতো নয়—দেখার মতো। যখন নৌকায় করে নদী ঘুরছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি যেন একটি নদীতে নই, বরং কোনো গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, তার জায়গায় আছে মানুষের তৈরি অসংখ্য দেয়াল।
এ সব দেয়ালের প্রভাব শুধু মাছের ওপরই নয়; পুরো নদীব্যবস্থাই এক গভীর সংকটে পড়ে গেছে। বেড়াগুলো পানির স্বাভাবিক চলাচল রুদ্ধ করে রেখেছে, ফলে শ্রীরায়ের চর ব্রিজ থেকে কালীরবাজার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটারজুড়ে জমে গেছে ঘন কচুরিপানা। এই কচুরিপানার স্তর এতটাই জমাট যে নৌকা এগোতেই চায় না। মাঝিদের নৌকা টেনে নিতে হয়, কখনও কখনও কয়েক মিনিটের পথ পাড় হতে লাগে ঘণ্টারও বেশি। নদী যেখানে অঞ্চলের মানুষের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম—সেখানে এই বাধা প্রতিদিনই তাদের জীবনে বাড়তি দুর্ভোগ ডেকে আনছে। কিন্তু দুর্ভোগ সত্ত্বেও নদী নিয়ে তাদের কিছুই করার নেই; কারণ নদীজুড়ে যাদের নিয়ন্ত্রণ, তারা সাধারণ মানুষের আওতার বহু বাইরে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসেবটিও কম ভয়াবহ নয়। প্রতিটি বেড়া থেকে বছরে প্রায় দুই মেট্রিক টন মাছ নিধন হয়। ৬০০-র বেশি বেড়া মানে বছরে প্রায় ১,২০০ মেট্রিক টন দেশি মাছ নদী থেকে উধাও। বাজারদর হিসেবে যার মূল্য কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে আগামি বছরগুলোতে। কিন্তু অর্থনীতির এই ক্ষতি শুধু সংখ্যায় মাপলে ভুল হবে; কারণ এর পেছনে আছে নদীর পরিবেশগত ধ্বংস, মাছের প্রজননচক্রের ভাঙন, জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের বিপর্যয় এবং নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবিকার ধস। ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ছে, বাচ্চা মাছ ধরা পড়ছে, মাঝারি মাছ ধরা পড়ছে—অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাছের জন্মই রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন যেখানেই বাধাগ্রস্ত হয়, সেখানেই প্রজাতি বিলুপ্তির দিকে এগোয়। ধনাগোদা সেই পথেই হাঁটছে।
আইন আছে—১৯৫০ সালের মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন পরিষ্কারভাবে বলছে, নদীতে বেড়া বা বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা অপরাধ। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযানও চালায়। কিছু বেড়া ভাঙা হয়, কিছু জাল জব্দ হয়, কিছুদিন নদীতে স্বস্তির বাতাস বইতেও থাকে। কিন্তু সেই স্বস্তি ভীষণ ক্ষণস্থায়ী। অভিযান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রভাবশালীরা আবারও একই জায়গায় বেড়া বসিয়ে দেয়। যেন নদীর ওপর তাদের অঘোষিত মালিকানার স্বীকৃতি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
আমি একসময় ভেবেছিলাম—প্রশাসন হয়তো সক্ষমতার অভাবে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিন্তু ধনাগোদা নদীর বাস্তবতা দেখে মনে হলো—সমস্যাটি আরও গভীর। এখানে আইন, প্রশাসন, স্থানীয় ক্ষমতাবান এবং নদীর ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। যেখানে আইন দুর্বল, প্রভাবশালী শক্তিশালী, আর নদী—অসহায়।
নদী কি শুধু একটি জলপ্রবাহ? আমার কাছে নদী মানে একটি জীবন্ত দেহ, যার শিরায়-উপশিরায় পানি স্রোত বয়ে যায়; যার ওপর নির্ভর করে মাছ, প্রাণী, মানুষ—অগণিত অস্তিত্ব। সেই নদীর শিরা যদি বাঁশের বেড়ায় চেপে ধরা হয়, সে কি বেঁচে থাকতে পারে? পারে না। ধনাগোদার বর্তমান অবস্থা তার প্রাণ সংকেতই জানাচ্ছে। একসময় এই অঞ্চলে মাছ ধরার মৌসুম এলেই নদীজুড়ে নৌকাগুলোর নাচন দেখা যেত। ডাঙায় দাঁড়িয়ে থেকেও মাছের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা যেত। এখন নদীর বুক শুনে মনে হয়—এটি যেন এক নীরব, প্রাণহীন বিস্তৃতি। মাছ নেই, গতি নেই, প্রাণ নেই। যে নদী একসময় জীবনের প্রতীক ছিল—সেই নদী আজ মানুষের লোভের প্রতীক হয়ে উঠেছে। নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে, নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে আমি ভাবি—এই নদীকে বাঁচাবে কে? প্রশাসন কি সত্যিই শক্ত হাতে এগোবে? স্থানীয় মানুষ কি একজোট হতে পারবে? নাকি পরিবেশ সচেতন নতুন প্রজন্মই একদিন এই অন্যায় দখল ভেঙে ফেলবে?
সমস্যা জটিল, কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, যদি নিয়মিত অভিযান হয়, যদি নদী বিষয়ক স্থানীয় কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখে, যদি জনগণ ভয়েস তোলে—তাহলে নদীকে উদ্ধার করা যায়। কারণ নদীকে রক্ষা করা মানে শুধু মাছ রক্ষা নয়; এটি রক্ষা করা মানে জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য, জীবিকা, মানুষ এবং আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা। ধনাগোদার যা পরিস্থিতি, তা কেবল একটি নদীর সংকট নয়—এটি বাংলাদেশের অসংখ্য নদীর প্রতিচ্ছবি। কোথাও দখল, কোথাও দূষণ, কোথাও কচুরিপানায় দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু। নদী মরলে দেশও মরে—এ সত্য আমরা অনেকেই ভুলে যাচ্ছি।
ধনাগোদা আজ যে ২০ কিলোমিটারব্যাপী অবৈধ ফাঁদের শিকার, ভবিষ্যতে তা ৩০ কিলোমিটারেও পৌঁছাতে পারে, যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। মাছের যে ১,২০০ মেট্রিক টন ক্ষতি এখন দেখা যাচ্ছে—তা হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ–ত্রিগুণ হবে। এই ক্ষতি শুধু অর্থের নয়; এটি পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক ক্ষতি। সেই কারণেই আমি মনে করি—ধনাগোদাকে বাঁচানো মানে একটি নদীকে ফিরিয়ে আনা নয়; এটি একটি সমাজের বিবেককে জাগিয়ে তোলার কাজ। আজ যে নদী আর্তনাদ করছে, কাল সেই আর্তনাদ হয়তো দেশের আরও বহু নদী থেকে শোনা যাবে। আমরা কি সেই দিনের অপেক্ষা করবো? নাকি আজই সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলবো—নদী বাঁচাও?
ইতিহাস হয়তো ছোট নদীর মৃত্যুকে আলাদা করে মনে রাখবে না। কিন্তু নদীর মৃত্যু যাদের জীবনে দুর্ভোগ ডেকে আনবে—তারা আমাদের আজকের উদাসীনতাকে কখনো ক্ষমা করবে না।
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।
#সবাই #ধনাগোদা #নদী #মতলব