June 24, 2026, 11:49 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

“রক্ষা হলে ধনাগোদা নদী, বাচবে মতলব-ফলবে ফসল, ফুটবে হাসি সবার মুখে”

Reporter Name
ধনাগোদা নদী, মতলব।

চাঁদপুর জেলার মতলব (উত্তর-দক্ষিণ) মাঝ দিয়ে ও দাউদকান্দি উপজেলার পশ্চিম অংশ জুড়ে বয়ে চলেছে মেঘনা আপার থেকে উৎপত্তি ধনাগোদা নামক ছোট্ট একটি নদী। যা পুনরায় মতলবের পশ্চিম প্রান্তে মেঘনায় গিয়ে মিশেছে। এই নদীটি অত্র অঞ্চলের জন্য আল্লাহ একটি বিশেষ নেয়ামত স্বরুপ। যার বর্ষাকালীন সময়ে বয়ে আনা পলি মাটি ভালবাসায় দু’কূলে জন্মায় কত-শত অর্থকরী ফসল। যার উপর নির্ভর করে বেচে আছে হাজার হাজার জেলে সহ নানা পেশা-শ্রেণির মানুষ।

ধনাগোদা নদীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা :

ধনাগোদা কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ২২৯ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক ধনাগোদা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ১১।

উৎপত্তি ও প্রবাহ :

ধনাগোদা নদীটি চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলব উপজেলার বাগানবাড়ি ইউনিয়নে প্রবহমান মেঘনা আপার নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। অতপর নদীটি একই উপজেলার ফরাজিকান্দি ইউনিয়ন অবধি প্রবাহিত হয়ে পুনরায় মেঘনা আপার নদীতে পতিত হয়েছে। বিপুল জলরাশি, মৎস্য ও প্রাণিকূলের বিশাল সম্ভারে সমৃদ্ধ এ নদী। মতলব উঃ ও মতলব দঃ এর মাঝে বিভক্তকারী এ নদী। ধনাগোদা নদীর উত্তর তীরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক বেড়ী বাঁধ নির্মাণ করা আছে। এই বেড়ী বাঁধ বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয়।

উল্লেখযোগ্য খালসমূহ :

মতলব দক্ষিণ উপজেলা ও আশেপাশের অঞ্চলের বিভিন্ন খাল ধনাগোদা নদীর সাথে সংযুক্ত। মতলব উত্তরের খালসমূহও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাম্পের মাধ্যমে এই নদীর সাথে যুক্ত রয়েছে। যার মাধ্যমে বেরি বাধের ভেতরে ফসলী জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা রয়েছে।

জমজম খাল : জমজম খালটি মতলব দক্ষিণ উপজেলার দগরপুর গ্রাম হতে শুরু করে হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও বাজার ও চাঁদপুর সদর উপজেলার মধুরোড রেলওয়ে স্টেশনের পাশ দিয়ে গিয়ে আলগী গ্রামের নিকট ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে মিশে যায়। ধনাগোদা নদীতে সংযুক্ত সাচার খালটি বিতারা, তেতৈয়া, কোমরকাশা হয়ে কচুয়া পৌর বাজারের (মূল বাজার) পশ্চিম পাশ ঘেঁষে উপজেলার দক্ষিণ অঞ্চলের কড়ইয়া, কালোচোঁ হয়ে কাঁঠালী গ্রামের কাছে এসে বোয়ালজুড়ি খালের সাথে মিশে হাজীগঞ্জের নিকট ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

বোয়ালজুড়ি খাল : এই খালটি ধনাগোদা নদীর মাছুয়াখাল প্রান্ত থেকে নারায়ণপুর বাজার হয়ে মেহারন, চারতভাঙ্গা, ধড্ডা হয়ে হাজীগঞ্জের নিকট ডাকাতিয়া নদী পর্যন্ত বিস্তৃত।

নৌ যোগাযোগ ও পারাপার :

একটা সময় ধনাগোদা নদীই ছিল মতলব উপজেলায় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ধনাগোদা নদীর লঞ্চ যোগাযোগ ব্যবস্থা মতলব দক্ষিণ উপজেলাকে ঢাকা ও নারায়ণঞ্জ শহরের সাথে যুক্ত করে। বর্তমানে অনেকটা সীমিত আকারে এ নদীর মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে মালামাল ও লঞ্চ যোগে যাত্রী পারাপার করা হয়।

মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ তথা চাঁদপুরের সাথে ঢাকার সড়ক পথে যোগাযোগ সহজ করার জন্য ধনাগোদা নদীর উপর দুইটি সেতু নির্মাণ করা হয়। একটি শ্রীরায়েরচর সেতু অপরটি মতলব সেতু । শ্রীরায়েরচর সেতুটি মতলব উত্তর উপজেলার বাংলাবাজার এবং কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার শ্রীরায়েরচরকে যুক্ত করে। আর মতলব সেতুটি মতলব (উত্তর-দক্ষিণ) দুই উপজেলাকে যুক্ত করেছে। মতলব বাজার সংলগ্ন পূর্ব দিকে মতলব সেতুর দৈর্ঘ্য ৩০৪ দশমিক ৫১ মিটার। মতলব সেতুর নির্মাণ কাজ ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় এবং ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

পরিবেশ বিপর্যয় ও মৎস্য শিকার :

স্থানীয় বয়োজেষ্ঠ্যদের কাছ থেকে জানা যায়, ধনাগোদা নদী থেকে স্থানীয়ভাবে ১৯৫০ সালের মৎস্য সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে বিভিন্ন স্থানে বেড়া বা বাঝা দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। যার ফলস্বরুপ নদীটি নাব্যতা হারিয়ে দিন দিন সরু হয়ে চর পরে মরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে দখল-দূষণের সংকটের মুখে একদিকে যেমন পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে যার কারণে, হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ বিশাল এক সম্ভার। ধনাগোদা নদী থেকে গত এক দশকে হারিয়ে গেছে প্রায় ২০ প্রজাতির সুস্বাধু মাছ। নদীর তীরে বালু মহল গড়ে উঠায় পরিবেশ দূষিত হয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে এলাকাবাসী। এছাড়াও আরো বেশ কিছু কারণ রয়েছে এক সময়ের খরস্রোতা নদীটির পরিবেশ বিপর্যয় ও দূষনের জন্য। যেমন :

১. নদীর পাড়ে গড়ে উঠা ইটভাটার পোড়া কয়লা, ইট ও বর্জ্য নদীতে ফেলা।

২. দুই পাড়ের বাজারগুলোর বর্জ্য ও আবর্জনা।

৩. নদীর জায়গাসমূহ ক্ষমতার অপব্যবহার করে দখল করে নেয়া, যা ভরাট করতে ময়লা ফেলে নদী ভরাট।

৪. নদীর গতিরোধ করে বাঝা দেয়া। যার কারণে, বাস্তুসংস্থানের বিপর্যয় ও দেশীয় মৎস উৎপাদন ব্যাহত।

৫. নদীতে ভাসমান রেস্টুরেন্ট তৈরি করা এবং যার বর্জ্য ও আবর্জনা রাতের আধারে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া।

৬. নদীর মাঝেখানে চর পড়ে যাওয়া এবং পরিকল্পিত খননে অভাব।

প্রতিনিয়তই বিভিন্ন অজুহাতে নদীশাসন চলছে। নদীর দুই তীরে চলছে নতুন-নতুন ইটভাটা নির্মাণের মহা উৎসব। এসব হতে নির্গত বর্জ্য পদার্থ সরাসরি নদীর পানিতে পতিত হয়। যা নদীর পানিকে দূষিত করে। নদীকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বাজার গড়ে উঠছে। যার অধিকাংশ পরিকল্পনাবিহীন। অপরিকল্পিত এসব কাজের ফলে নদীটি আজ হুমকির সম্মুখীন। এছাড়া এখনও নদীতে বড় বড় জলযানসমূহ চলাচল করে। এসব জলযান থেকে নির্গত তেল জাতীয় পদার্থ ও বর্জ্য নদী দূষণের অন্যতম কারণ। নদীর পাড়ে থাকা মতলব বাজার সহ আশে পাশের আরো বাজারের আবর্জনা – বর্জ্য পদার্থগুলো অধিকাংশ সময় নদীর তীরে অপসারণ করা হয়। অবশিষ্ট উচ্ছিষ্ট আবর্জনা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ড্রেন, নালা, নর্দমা, খাল বিলের মাধ্যমে নদীতে পতিত হয়। ফলে নদীগুলো তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারাচ্ছে। তাছাড়া নদী ভরাট করে জায়গা দখল করার প্রতিযোগিতা তো আছেই। প্রভাবশালী মহল নদীর দুই তীর ভরাট করে বিভিন্ন ভবন গড়ে তুলছে। ফলে নদীগুলো ক্রমশ সরু হয়ে আসছে। একসময় পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেলে নদীটি মারা যাবে। তার উপর নেই পরিকল্পিত খনন ব্যবস্থা। বন্যার কবলে পরে দুই তীরে ভাঙন দেখা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। যার কারণে, হাজার হাজার কৃষি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

শেষ কথা, শেষ নয়!

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এদেশে জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নাম না জানা অসংখ্য নদ- নদী। পৃথিবীতে এত নদীবিধৌত দেশ দ্বিতীয় আরেকটি নেই। কবি অতুল প্রসাদ সেন এর মতে এদেশ তেরশত নদীর দেশ। মূলত নদীমাতৃক বাংলার নদ- নদী’র আধিক্যতা বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু নদীমাতৃক বাংলার পূর্বের সেই রূপ আর নেই। নানাবিধ কারণে নদীগুলো আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

একসময় ছিল যখন ধনাগোদা নদীটি ছিল এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। নদীকে কেন্দ্র করে যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালিত হত। মূলত এই নদী পথের যোগাযোগের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এর তীরে গ্রাম, হাট বাজার গড়ে উঠেছে। প্রত্যেক বছর বন্যায় নদীর অববাহিকায় বিপুল পরিমাণ পলিমাটি বয়ে নিয়ে আসে। যা জমির উর্বরা শক্তিকে বৃদ্ধি করে। ধনাগোদা নদীর পানির সহজলভ্য সেচ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ফসল আবাদ হয়। যা ফলে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমায়।

একটা সময় যদিও এই নদীতে প্রচুর পরিমাণ দেশীয় মাছ পাওয়া যেতো। যা জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকার প্রধান উপজীব্য ছিল। যা বর্তমানে বিরুপ্ত প্রায় বলা যায়। ধনাগোদা নদীটির উপর এই অঞ্চলের মানুষ খাদ্যের জন্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। মানুষের কল্যাণে নদীটি তার সর্বত্র বিলিয়ে দিলেও কেউ তার এই উপকার স্বীকার করতে রাজি নই।

তাই এখনও সময় আছে আসুন আমাদের প্রিয় ধনাগোদা নদীটি সবাই রক্ষায় সোচ্চার হয়ে আওয়াজ তুলি। “রক্ষা হলে ধনাগোদা নদী, বাচবে মতলব-ফলবে ফসল, ফুটবে হাসি সবার মুখে।”

লেখক :

আজম পাটোয়ারি

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা