শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ড না থাকলে জাতি দাঁড়াতে পারে না, গতি পেতে পারে না। আর সেই মেরুদণ্ডের কৌশলী নির্মাতা হচ্ছেন শিক্ষকরা। তারা সেই নীরব সৈনিক, যাদের হাত ধরে একটি শিশুর মননে অ-আ লেখা গেঁথে দেওয়া হয়। তারা শুধু জ্ঞান দেন না, চরিত্র গড়েন, সমাজের মূল্যবোধ ধারণ করান। কিন্তু আমরা কি জানি, সেই শিক্ষক সমাজের প্রতি আমাদের ধ্যান, সম্মান বা সংরক্ষণ কতটুকু? আমাদের সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত? দুঃখজনক হলেও সত্যি, আজকের বাস্তবতায় শিক্ষকের নিরাপত্তা এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়।
গোটা দেশের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেই দেখা যাবে, শিক্ষকদের প্রতি সমাজের এই ধরনের অবহেলা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। গত ক’দিন আগে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাস্তায় ফেলে, বর্বরভাবে পিটানো হয়েছিল। সেই ঘটনায় শুধুই জনমনে শোক নয়, সমগ্র শিক্ষাজগতে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। আর আজ দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন একই দুর্ভাগ্যের শিকার। যারা শিশুর হাতে কলম ধরিয়ে অ-আ শেখান, যাদের মধুর কণ্ঠে প্রথম পাঠ শোনে শিশুরা, তারাই আজ রাস্তায় মার খাচ্ছে। এই পরিস্থিতি একজন সুস্থ নাগরিকের চোখে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষক সমাজকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্পষ্ট, অথচ সে দায়িত্ব কোথায় গিয়েছে? রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, সামাজিক অবহেলা আর কিছু ক্ষেত্রে মানুষের অজ্ঞতা মিলিত হয়ে তৈরি করছে এক ভয়ানক পরিস্থিতি। কিন্তু এও সত্যি যে, এই অবস্থা শিক্ষকদের নিজেদের সচেতনতার অভাবও কিছুটা প্রদর্শন করছে। নিজেদের পায়ে কুড়াল মারা, নিজের অধিকার রক্ষা না করা—এগুলোও সহিংসতার আগ্রাসনে ভূমিকা রাখছে।
যারা দেশের ক্ষমতার শীর্ষে বসে আছেন, তারা নিজেদের শাসক মনে করেন। কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ক্ষমতার আসন দখল করা এককালে দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। তারা আজ প্রধানত দখলদার। তাদের কাছে শিক্ষকের নিরাপত্তা চাওয়া মানে অরণ্যে রোদনের নামান্তর। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তি যদি শিক্ষকের অধিকারকে স্বীকার না করে, তাহলে এই জাতি কেমন হবে তা সহজেই বোঝা যায়। শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না, তারা শিশুর মননে স্বপ্ন বুনে দেন। শিক্ষকের উপস্থিতি শিশুর জীবনে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তার প্রতীক। সেই শিক্ষককে যদি ভয় দেখানো হয়, আঘাত করা হয়, তাহলে শিশুর মনে কি বার্তা যায়? যে সমাজ শিক্ষকের প্রতি সহানুভূতিহীন, সেখানে শিশু কীভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক হবে? শিক্ষককে সম্মান না করলে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব নয়।
আমাদের সমাজে শিক্ষককে কখনও কখনও শুধুই দায়িত্বশীলতা নয়, ন্যায্য সম্মানও দেওয়া হয় না। স্কুল থেকে বের হয়ে রাস্তায় যাত্রা করতে গিয়ে যে ঝুঁকি বহন করতে হয়, সেটা কোনো ভাবেই ন্যায্য নয়। শিক্ষকের পেছনে যে পদ্ধতি, যে জ্ঞান, সেই জ্ঞান আর পদ্ধতির মূল্যও তখন ক্ষুণ্ণ হয়। যে শিক্ষক অ-আ শেখাচ্ছে শিশুকে, তার জীবন যদি নিরাপদ না হয়, তার মানসিক চাপ কেমন হবে, সেটা কল্পনা করা যায়। শিক্ষকরা যুদ্ধে নেই, তারা সমাজকে গড়ে তুলছে। অথচ সমাজ তাদেরই শত্রু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি নয়, তা পুরো জাতির ক্ষতি। শিক্ষার মান হ্রাস পায়, মানবিক মূল্যবোধ ক্ষয় হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা কি চাই, এমন এক সমাজ যেখানে শিক্ষক নিরাপদ নয়, যেখানে শিশুদের শিক্ষার মান হ্রাস পাচ্ছে? না, আমরা চাই উন্নত, শিক্ষিত, সচেতন জাতি।
শিক্ষক সমাজের প্রতি সহিংসতা শুধুমাত্র শিক্ষার ক্ষতি নয়, এটি মানবিক দায়বদ্ধতারও চরম অবমাননা। শিক্ষকরা যারা অ-আ শেখায়, তারা শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষকের ভূমিকায় থাকে। সেই শিক্ষকের হাতে শিশুর ভবিষ্যৎ। যদি সেই হাত আজ ভয়, হুমকি, আঘাতের শিকার হয়, তাহলে শিশুর ভবিষ্যৎও নিরাপদ নয়। আমাদের সমাজ কি তা সহ্য করতে প্রস্তুত? এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে কেবল রাষ্ট্রের পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককেও এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকের নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষিত করতে হবে। শিক্ষকের প্রতি সহানুভূতি বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষক নির্ভয়ে শিশুদের হাতে কলম ধরাতে পারে। শিক্ষক শুধুই পাঠদাতা নয়, তারা সমাজের মানবিক মানদণ্ড রক্ষা করছেন।
শিক্ষক যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যায়। জাতি তার মেরুদণ্ড হারায়। শিক্ষকের অবহেলা মানে জাতির দুর্বলতা। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা মানে সমাজের অন্তরক্ষেত্রের ধ্বংস। তাই শিক্ষককে রক্ষা করা মানে জাতিকে রক্ষা করা। এটি কেবল নৈতিক দায় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও। আমাদের উচিত শিক্ষকের প্রতি সহমর্মিতা, সমর্থন ও সংরক্ষণ বৃদ্ধি করা। শিক্ষক যেন নির্ভয়ে শিক্ষা দিতে পারে, শিশুরা যেন সুষ্ঠুভাবে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। শুধুমাত্র তখনই আমরা একটি উন্নত, শিক্ষিত, মানবিক সমাজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব।
শিক্ষক সমাজের প্রতি সহিংসতা আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। এটি শুধু তাদের ক্ষতির ইঙ্গিত দেয় না, এটি আমাদের সমাজের মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরের দুশ্চিন্তারও প্রতিফলন। আমরা চাই একটি সমাজ যেখানে শিক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত, শিক্ষার মান উন্নত, আর শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ সুরক্ষিত। শিক্ষকরা জাতির মেরুদণ্ড। যদি সেই মেরুদণ্ড দুর্বল হয়, জাতি পড়বে। আমরা চাই না যে, শিক্ষক রাস্তায় মার খাচ্ছেন, শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হচ্ছে। আমাদের উচিত এই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা, যাতে জাতি দাঁড়াতে পারে, এগোতে পারে। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা মানে জাতির মেরুদণ্ডকে রক্ষা করা। রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।
আমাদের দেশ কেবল শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করলে এগোতে পারবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আইন প্রয়োগ করা নয়, শিক্ষকের মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করা। সমাজের প্রতিটি মানুষকেও সচেতন হতে হবে। শিক্ষককে সম্মান করতে হবে, যাতে শিশুদের হাতে কলম ধরানো স্বাভাবিক ও নিরাপদ হয়। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা মানে জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। শিক্ষক শুধু পাঠদাতা নয়, জাতির রক্ষক। তাদের প্রতি সহিংসতা মানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি অবহেলা। আমরা চাই না এমন এক সমাজ যেখানে শিক্ষক নিরাপদ নয়। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে একটি এমন সমাজ যেখানে শিক্ষক সম্মানিত, নিরাপদ এবং সন্তুষ্ট। তখনই জাতি তার মেরুদণ্ড বজায় রাখতে পারবে। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে, আর এটি কেবল নৈতিক নয়, এটি জাতির সুরক্ষার প্রশ্ন।
শিক্ষকরা যদি নিরাপদ থাকে, সমাজ উন্নত হয়। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা মানে শিক্ষার মান বৃদ্ধি, জাতির উন্নয়ন, শিশুদের সুষ্ঠু শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সুরক্ষা। আমরা সকলকে সতর্ক করতে চাই, শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। জাতির মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ একত্রে কাজ করলে শিক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমাদের দায়িত্ব এখনই। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। জাতির মেরুদণ্ডকে রক্ষা করতে হবে। কেবল তখনই আমরা একটি উন্নত, শিক্ষিত, মানবিক সমাজ পেতে পারব। শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা মানে জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
শিক্ষক সমাজকে আমরা যেন নিরাপদে রাখতে পারি, সম্মান দিতে পারি। কারণ শিক্ষকের প্রতি সহিংসতা মানে জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল হওয়া। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি একত্রে কাজ না করে, শিক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তাহলে জাতি তার ভবিষ্যৎ হারাবে। আমরা চাই না এমন বাস্তবতা। শিক্ষকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা মানে জাতিকে রক্ষা করা।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।