দেশের প্রথম প্রকৃত ক্যাবল স্টেইড (ঝুলন্ত) সেতু হিসেবে নির্মাণাধীন মতলব-গজারিয়া সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন ও জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন সেতু বিভাগ। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সহযোগিতা তহবিল (EDCF) থেকে স্বল্পসুদে অর্থায়নের চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং অর্থ ছাড়ের পরপরই টেন্ডার আহ্বান করে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন সেতু মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ভিখারউদ্দৌলা চৌধুরী ভুলু।
গত শনিবার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার শরীফ উল্লাহ্ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও নবগঠিত অ্যাডহক কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
যুগ্ম সচিব বলেন, অত্যন্ত কম সুদে এই সেতুর অর্থায়ন হচ্ছে। বাংলাদেশে এর চেয়ে কম সুদে কোনো সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের নজির নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় শুরুতে প্রকল্পের ৬৭ শতাংশ পণ্য তাদের দেশ থেকে আনার শর্ত ছিল। কিন্তু আমরা সফল আলোচনার মাধ্যমে তা ২৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। বাকি উপকরণ যেমন রড, সিমেন্ট, বালি এবং শ্রমশক্তি বাংলাদেশ থেকেই ব্যবহার করা হবে। এতে দেশের অর্থ দেশেই থাকবে।
তিনি আরও বলেন, মতলব-গজারিয়া সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সংসদ সদস্য ড. মো. জালাল উদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত একটি জটিলতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আটকে গেলে এমপির হস্তক্ষেপে তা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এরপর প্রশাসন, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে রেকর্ড সময়ে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
ভিখারউদ্দৌলা চৌধুরী ভুলু বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে জমি অধিগ্রহণের কাজ খুব কমই হয়েছে। তিনটি টিম গঠন করে মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনও দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও কাগজপত্র সম্পন্ন করেছে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ বাবদ ১২ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে এবং আইবাস (iBAS) সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তারা দ্রুত ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়াকে সংযুক্ত করতে মেঘনা নদীর ওপর নির্মিত হবে ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন এই ক্যাবল স্টেইড সেতু। আধুনিক প্রকৌশল নকশায় নির্মিত সেতুটিতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা বজায় রাখতে ২৫ মিটার উঁচু ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সেতুর উভয় পাশে ছয় লেনের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে চার লেন হবে মূল সড়ক এবং দুই পাশে থাকবে সার্ভিস লেন। পাশাপাশি আড়াই কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ করা হবে, যাতে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি সেতুর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়া সেতু নির্মাণের পর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের ৬২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ প্রশস্ত করে উন্নতমানের ফোর লেন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সড়ক চাঁদপুর হয়ে ফেনী ও চট্টগ্রামের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের নতুন করিডর তৈরি করবে এবং জাতীয় মহাসড়ক এন-১-এর একটি কার্যকর বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মতলব-গজারিয়া সেতু বাস্তবায়িত হলে শুধু চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ নয়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এটি মেঘনা নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।