“বড় ভূমিকম্প আসার আগে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, যাকে বলা হয় ফোরশক। ইদানিং ফোরশক অনেক হচ্ছে, গত দু্ই-তিন মাসে ভূমিকম্প অনেক বেড়ে গেছে।”
বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়ায় একে বড় ভূমিকম্পের বার্তা মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশ বা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুনের ব্যাখ্যায়, ঘন ঘন কম মাত্রার যে ভূমিকম্পগুলো হচ্ছে সেগুলো ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি হওয়ার মত যে শক্তি ভূতকের মধ্যে জমা হয়ে আছে, এই শক্তিটা বের হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
“বাংলাদেশ কম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হলেও ঝুঁকির দিক দিয়ে খুব উপরে রয়েছে। যে পরিমাণ শক্তি ইন্ডিয়ান-বার্মা প্লেটের সংযোগ স্থলে জমা হয়ে আছে, সেই শক্তিটা যদি বের হয় তাহলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। এটা আগামীকালও হতে পারে, আগামী ৫০ বছর পরেও হতে পারে। কখন হবে সেটা আমরা বলতে পারি না, তবে যেটা হবে সেটা খুব মারাত্মক হবে। সাবডাকশন জোনের ভূমিকম্পগুলা ভয়ঙ্কর হয়।”
অধ্যাপক হুমায়ুন তথ্য দিয়েছেন, ভূমিকম্প, অগ্নুৎপাত, পাহাড়-পর্বতের সৃষ্টি এ সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ভূত্বক গঠনকারী প্লেটগুলোর সঞ্চারণের ওপর। পৃথিবীর উপরিভাগের ৭০-১০০ কিলোমিটার পুরুত্বের লিথোস্ফিয়ার ছোট-বড় ১৩টি খণ্ডে (প্লেটে) বিভক্ত। উত্তপ্ত ও নরম এস্থোনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসমান এ প্লেটগুলো গতিশীল।
বাংলাদেশের উত্তরে আছে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল; পূর্বে বার্মিজ প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল। প্লেটগুলো গতিশীল থাকায় বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের মধ্যে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাব্য ফাটলগুলোর একটি সিলেট-মেঘালয় সীমান্তের ডাউকি ফল্ট এবং চট্টগ্রাম উপকূল বরাবর সীতাকুণ্ড-টেকনাফ ফল্ট।
এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সমতল ভূমিতে অসংখ্য ফাটল রয়েছে, যা থেকে ভূমিকম্প হতে পারে। ঢাকার পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে ও দক্ষিণে অর্থাৎ চারপাশেই ভূমিকম্প সৃষ্টির মত ফাটল আছে।
এতে রাজধানী ঢাকার বর্তমান অপরিকল্পিত অবকাঠামো ব্যবস্থার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও তাদের। ভূমিকম্প মোকাবেলায় দেশে প্রস্তুতির ঘাটতিও দেখছেন তারা; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি স্বীকার করেছে।
মিয়ানমারে গত ২৮ মার্চ ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশেও এমন পরিস্থিতির শঙ্কা আরও বেড়েছে। ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারের উপরে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর এ অঞ্চলে ঘন ঘন ভূমিকম্পের প্রবণতাই আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের জন্যও।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সও এমন শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশেও একই মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চল উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ক্ষতির শঙ্কা কতটা?
২০০৯ সালে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার এক যৌথ জরিপের ফল বলছে, ঢাকায় ৭ বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে শহরের ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে; এক লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক-সিরিয়ায় ৭ দশমিক ৮ মাত্রা এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প হয়। এতে দেশ দুটির ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ওই ভূমিকম্পে তুরস্কের এক লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি ভবনের ৫ লাখ ২০ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট ধ্বসে পড়ে।
বাংলাদেশে এ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলে এর চেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করছেন অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী।
বুয়েটের এ শিক্ষক বলেন, “এ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশে হবেই। বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারেও হতে পারে, মধুপুর, শ্রীমঙ্গলেও হতে পারে। কিন্তু আমাদের এখানে ক্ষতি বেশি হবে, কারণ আমাদের জনসংখ্যা বেশি।
যেহেতু ঘন ঘন ভূমিকম্প হয় না, দেড়শ বছরের চক্র- মানুষের স্মৃতিতে থাকে না। এখানে কয়েক লাখ মানুষ মারা যাবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছেন, ঢাকা শহরে যেসব ভবন রয়েছে ভূমিকম্পে এর ১ শতাংশ ‘ধূলিসাৎ’ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে দুই লাখ মানুষ হতাহত হবে; আর অবরুদ্ধ হবে ৫ থেকে ৭ লাখ মানুষ।
“যদিও ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার দূরত্ব ৭০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। আমাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হবে, তারপরে আমরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব, সে সক্ষমতা অর্জন করি নাই। অর্জন করার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি বা সরকারের পরিকল্পনা থাকা দরকার সেটা নাই।”
এখন যদি উচ্চ, মাঝারি বা বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকা শহরের জলাশয় ভরাট করে যেসব দালানকোঠা তৈরি হয়েছে, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে-সেসব এলাকা খুব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার মধ্যে বাসাবো, খিলক্ষেত, রামপুরা, আগারগাঁও, মিরপুর, ধানমণ্ডি, উত্তরা ও এর আশপাশ এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় মাঝারি মানের ভূমিকম্প হলেও অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর কারণ সরু রাস্তা ও জীর্ণশীর্ণ ভবন।
মোহাম্মদপুর, বসিলা, আগারগাঁওয়ের মতো এলাকাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। আগারগাঁওয়ের যেসব সরকারি অফিসপাড়া রয়েছে, এগুলোও জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে, যার কারণে এসব এলাকা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। একমাত্র যেসব ভবন বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে উপযুক্ত নির্মাণকৌশল, নকশা, গুণগতমান বজায় রেখে সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং ভবনের চারপাশে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে, সেসব ভবন অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মানুষ নিরাপদে সেসব ভবন থেকে বের হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আসতে পারবে। কিন্তু এর সংখ্যা কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভবনের গায়ের সঙ্গে গা মিলিয়ে সারি সারি ভবন দাঁড়িয়ে আছে এ শহরের কোলজুড়ে; এ কারণে অপেক্ষাকৃত দুর্বল সক্ষমতার যেসব বিল্ডিং রয়েছে, সেগুলো যদি ভূমিকম্পে ধসে পড়ে তবে এর দেওয়ালজুড়ে যত ভালো মানের বিল্ডিংই করা হোক না কেন, তা আর টিকে থাকতে পারবে না।
ঢাকা শহরের মাটির গঠন-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ শহরে বেশিরভাগ অঞ্চলেই পাঁচতলার অধিক ভবন করার মতো অবস্থা নেই; অথচ সেসব জায়গায় সাত-আটতলা, দশতলা ভবনের নকশাও রাজউক থেকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, যা ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হতে পারে।
রাজউকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী থাকলেও সেখানে কোনো ভূতাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় না-এটিও একটি আশ্চর্যের বিষয়। অথচ এখানে ভূতাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার বহু কাজ রয়েছে। রাজউকের ঢাকা শহরের মাটির গঠন, প্রকৃতি, পানির উৎস ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা সেল থাকা দরকার, যারা অত্যন্ত সুবিবেচনাপ্রসূত হয়ে রাজউককে সঠিক পরামর্শ দেবে।
কেমন প্রস্তুতি প্রয়োজন?
বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়নের বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্পের ফলে ক্ষয়ক্ষতি কম হবে। ফলে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলা পশ্চিমাঞ্চলে স্থানান্তর করা গেলে ঢাকার ক্ষতি হলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা যাবে।
ভূমিকম্প আজ হোক, কাল হোক হবেই- এতে সন্দেহ নেই। জনগণকে ব্যপকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে। ঘুরে দাঁড়াবার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এদিকে সরকারের কোনো প্রস্তুতি নেই।”
নিয়মিত সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতে ভূমিকম্পের মহড়া করে মানুষের মানসিক মনোবল তৈরির পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
সরকার থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে যেসব স্থাপনা তৈরি করা হবে সেগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন, আবহাওয়াবিদ রুবাঈয়্যাত কবীর।
“এবং নির্মাণের সময় ওই অঞ্চলের জিওলজি মেইটেইন করতে হবে। ভূমিকম্প হলে লিফট, স্কেলেটর ব্যবহার করা যাবে না, হুড়োহুড়ি করা যাবে না, বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া এসব নিয়ম সচেতনতার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে।”
ভূমিকম্পের ক্ষতি মোকাবেলায় মেহেদী আহমেদ আনসারীর পরামর্শ, নতুন পুরাতন সব ভবন মজবুত করে তুলতে হবে, ফায়ার সার্ভিসের প্রস্ততি বাড়াতে হবে, আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে, ফায়ার সার্ভিসের সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ সিস্টেম জোরদার করতে হবে।
পরিশেষে বলব, ভূমিকম্প মোকাবিলায় সরকারকে এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, বড় মাত্রার ভূকম্পন হওয়ার পর কংক্রিটের স্তূপ সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা, শহরের দুর্বল অবকাঠামোগুলোকে চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলা বা রেক্ট্রোফিকেশন করা, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড সঠিকভাবে মেনে চলা, রাজউককে শক্তিশালী করা, রাজউক থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা, সঠিকভাবে ভবনের নকশা প্রণয়ন ও তা যাচাই করা, জায়গাভেদে চার-পাঁচতলার বেশি উচ্চভবন না করা, ক্লাস্টার হাউজিংয়ে নিরুৎসাহিত করা, জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ না করা, জলাশয় ভরাট আইনত দণ্ডনীয় তা প্রতিপালন করা, শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার করা, নদীগুলো দূষণমুক্ত রাখা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের নিয়ে ভূমিকম্প সেল গঠন করা ইত্যাদি।
ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে ভূমিকম্পবিষয়ক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা, প্রতিটি অফিসে মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে তা ব্যাপকহারে শহরের মানুষদের উজ্জীবিত করবে এবং মানুষ ভূমিকম্পের সময়ে করণীয় সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হবে।