ডিসেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে চাঁদপুর জেলায় শীতের তীব্রতা চরমে উঠেছে। গত চার-পাঁচদিন ধরে সূর্যের দেখা নেই বললেই চলে। সকালে ঘন কুয়াশা চারপাশ ঢেকে রাখে দুপুর পর্যন্তও কোথাও কোথাও একহাত দূরেও স্পষ্ট দেখা যায় না। তীব্র হিমেল বাতাসে কাঁপছে মানুষ। দিনের বেলায়ও শীতের কামড় যেনো থামছেই না।
শীতের এই প্রকোপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে নদীবেষ্টিত মতলব উত্তর উপজেলায়। মেঘনা ও ধনাগোদা নদীর বাতাস হাড় কাঁপানো শীত এনে দিয়েছে মানুষের জীবনে বাড়তি দুর্ভোগ। সকালে কর্মজীবী মানুষের রাস্তায় বের হতে দেরি হয়। খেটে খাওয়া মানুষজন দিনমজুরির কাজ না পেয়ে নানা বিপাকে পড়েছে। কৃষকরা ফসলের পরিচর্যা করতে পারছেন না জমিতে, যারা সকালে রিকশা-ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামেন, তাদের হাঁটুর নিচের পা জমে আসে ঠাণ্ডায়।
গ্রাম ও বাজারপাড়ায় রাত ও ভোরে মানুষের ভিড় দেখা যায় আগুনের পাশে। কাঠ, পাতায় জ্বালিয়ে শরীর সেঁকে নেয় তারা।
শীত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশু ও বয়স্কদের রোগব্যাধি বাড়ছে ভয়াবহভাবে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টের রোগী প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্টে নিম্ন আয়ের মানুষ
খেটে খাওয়া মানুষজনের সবচেয়ে বড় সমস্যা গরম কাপড়ের অভাব। অনেকেরই পরার মতো মোটা কাপড় নেই। বড়রা কোনোভাবে সামাল দিলেও শিশুদের কষ্ট বেশি চোখে পড়ে।
এদিকে ছেংগারচর, কালিপুর, নতুন বাজার, সুজাতপুর বাজারে এখন লেপ সেলাইকারীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। সকালে দোকান খোলার আগেই ক্রেতাদের লাইন। চাহিদার কারণে মূল্যও বেড়ে গেছে।
কুয়াশার কারণে নৌপথে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাতে নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মতলব উত্তরের মোহনপুর এলাকায় ঘন কুয়াশায় যাত্রীবাহী লঞ্চের সঙ্গে একটি বালুবাহী বাল্কহেডের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে বড় বিপর্যয় এড়ালেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের মাঝে।
শীতকবলিত মানুষের মাঝে মতলব উত্তরে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক সংগঠন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম এ বছর তেমন দেখা মিলেনি।
স্থানীয় কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, এ শীত তো গ্রামের গরিব মানুষরে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। কাজকম কমে গেছে। রাতে ঘুমাইতে পারি না।
রিকশাচালক সবুজ জানালেন, লেপ-কম্বল নাই। তিন বাচ্চারে নিয়া কী করি? শীতের ঘর থেকে বের হতে পারছি না, কাজ করতে পারি না, ঘরে টাকা নাই।
লেপ ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা দ্বিগুণ। তুলা এবং ফেব্রিকসের দাম বাড়ায় লেপ-তোশকের দাম।
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. মোবারক হোসেন জানান, গত দুই সপ্তাহে শিশু রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শীতের সময় শিশুদের কান-মাথা ঢাকা রাখতে হবে, ভোরের ঠাণ্ডা বাতাসে বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ, পর্যাপ্ত গরম খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
চাঁদপুর আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক শাহ মো. শোয়েব বলেন, চাঁদপুর জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় বাতাসের আপেক্ষিক আদ্রতার গড় ছিল ৯৭%। বর্ধিত ৫ দিনের শেষের দিকে রাত ও দিনের তাপমাত্রা কমতে পারে।