পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন দেশের ইতিহাসে এমন একজন বা একাধিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের জাতির জনক, প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিংবা স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভূমিকা নিয়ে একাডেমিক আলোচনা থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু তাঁদের জাতি-গঠনের অবদান নিয়ে রাষ্ট্রিক স্বীকৃতিতে সাধারণত কোনো মৌলিক বিতর্ক থাকে না। বিস্ময়কর হলেও সত্য—অনেক দেশে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হলেও “জাতির জনক” প্রশ্নে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য বজায় থাকে। অথচ আমাদের দেশে এই প্রশ্নটি বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যারা নিজেদের দেশে এই বিতর্ক উসকে দেয়, তারাই আবার অন্য দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের ক্ষেত্রে অবনত মস্তকে স্বীকৃতি দেয়। এই দ্বৈত মানসিকতার পেছনে ইতিহাসবোধের ঘাটতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা এবং জাতীয় ঐক্যের অভাব গভীরভাবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কথা ধরা যাক। সেখানে George Washington-কে “Father of His Country” বলা হয়। তিনি শুধু প্রথম প্রেসিডেন্টই নন, বরং স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সেনাপতি এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনকারী প্রধান ব্যক্তিত্ব। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রবল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়, কিন্তু ওয়াশিংটনের প্রতিষ্ঠাতা মর্যাদা নিয়ে কোনো দলই প্রশ্ন তোলে না। তাঁর দাসপ্রথা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে একাডেমিক সমালোচনা আছে, কিন্তু তাঁকে জাতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অস্বীকার করার প্রবণতা নেই। কারণ রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তারা ইতিহাসকে দলীয় স্বার্থের উপরে স্থান দিয়েছে।
ভারতে Mahatma Gandhi-কে “জাতির পিতা” বলা হয়। তাঁর অহিংস আন্দোলন, সত্যাগ্রহ এবং উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ভারতে কংগ্রেস, বিজেপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য গভীর; তবুও গান্ধীর জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অটুট। তাঁর নীতির সমালোচনা হয়, তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়, কিন্তু তাঁকে ভারত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির নির্মাতা হিসেবে স্বীকার করতে কারও আপত্তি নেই। কারণ তাঁকে অস্বীকার করা মানে স্বাধীনতার ইতিহাসের মূল সূত্রকে অস্বীকার করা।
তুরস্কে Mustafa Kemal Atatürk-কে আধুনিক তুরস্কের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনি যে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, তা আজও তুর্কি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার নিয়ে বিতর্ক আছে, সমর্থন-সমালোচনা দুই-ই আছে; কিন্তু তাঁকে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অস্বীকার করা তুরস্কে কার্যত অকল্পনীয়। তাঁর ছবি, মূর্তি, নাম—সবই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সংরক্ষিত।
দক্ষিণ আফ্রিকায় Nelson Mandela-কে জাতির জনকসম মর্যাদা দেওয়া হয়। বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রাম, দীর্ঘ কারাবাস এবং পুনর্মিলনের রাজনীতি তাঁকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, কিন্তু ম্যান্ডেলার ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে কোনো বিভ্রান্তি নেই। তাঁকে অস্বীকার করা মানে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
চীনে Sun Yat-sen-কে আধুনিক চীনের জনক বলা হয়। চীন আজ কমিউনিস্ট শাসনে, কিন্তু সান ইয়াত-সেন ছিলেন প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা। তাইওয়ান ও মূল ভূখণ্ড—দুই জায়গাতেই তাঁকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও তাঁর ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে বিরোধ নেই। কারণ তিনি রাষ্ট্রগঠনের সূচনা করেছিলেন।
ঘানায় Kwame Nkrumah-কে জাতির জনক হিসেবে মানা হয়। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও স্বাধীনতার নেতৃত্বদানের প্রশ্নে তিনি অমোঘ। ঘানার রাজনৈতিক দলগুলো তাঁকে অস্বীকার করে না। বরং জাতীয় দিবসে তাঁকে স্মরণ করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ায় Sukarno-কে স্বাধীনতার ঘোষক ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখা হয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন জটিল ছিল, ক্ষমতা হারিয়েছেন, সমালোচিত হয়েছেন; কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা হয় না।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে “জাতির জনক” প্রশ্নে একটি ঐকমত্য থাকে। সমালোচনা থাকে, গবেষণা থাকে, পুনর্মূল্যায়ন থাকে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ভিত্তি অটুট থাকে। কারণ একটি জাতি বুঝতে পারে—রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস কোনো দলীয় সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র জনগণের যৌথ উত্তরাধিকার।
আমাদের দেশে সমস্যা শুরু হয় যখন ইতিহাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়। কোনো দল ক্ষমতায় এলে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন হয়, নামকরণ পাল্টে যায়, স্মৃতিস্তম্ভের ব্যাখ্যা বদলে যায়। ফলে জাতির জনক প্রশ্নটি দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ইতিহাস তখন আর নিরপেক্ষ গবেষণার বিষয় থাকে না; বরং ক্ষমতার ভাষ্যে রূপান্তরিত হয়। এতে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়, জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়। আরও লক্ষণীয়, যারা নিজেদের দেশে জাতির জনক নিয়ে বিতর্ক তোলে, তারাই বিদেশে গিয়ে ওয়াশিংটন, গান্ধী, অটাতুর্ক বা ম্যান্ডেলার নাম উচ্চারণ করলে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তারা কখনো বলে না যে ওয়াশিংটনের বিকল্প কেউ ছিলেন, বা গান্ধীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ তারা জানে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এসব প্রশ্ন তোলা হাস্যকর শোনাবে। কিন্তু নিজের দেশে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একই কাজ করতে দ্বিধা করে না। এই দ্বিচারিতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।
জাতির জনক মানে এই নয় যে তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে। তিনি মানুষ, তাঁর সীমাবদ্ধতা থাকবে। কিন্তু জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য—রাষ্ট্রের জন্ম, স্বাধীনতার নেতৃত্ব, জাতীয় পরিচয়ের নির্মাণে তাঁর অবদানের জন্য। এটি কোনো ব্যক্তিপূজা নয়; বরং ইতিহাসের স্বীকৃতি। একে অস্বীকার করা মানে রাষ্ট্রের জন্মকথাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
একটি স্বাধীন দেশে জাতীয় ঐক্যের কিছু মৌলিক ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। পতাকা, জাতীয় সংগীত, সংবিধান এবং জাতির প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব—এসব বিষয় নিয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য না থাকলে রাষ্ট্রীয় পরিচয় দুর্বল হয়। রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হবে, সরকার বদলাবে, মতাদর্শের দ্বন্দ্ব চলবে; কিন্তু রাষ্ট্রের জন্মদাতা ব্যক্তিত্বকে নিয়ে মৌলিক স্বীকৃতি অটুট থাকতে হবে। অন্যথায় প্রতিটি প্রজন্ম নতুন করে ইতিহাসের ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে বিভ্রান্ত হবে।
আমাদের প্রয়োজন ইতিহাসকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা। গবেষণা হোক, সমালোচনা হোক, কিন্তু তা হোক প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে। জাতির জনক প্রশ্নে অস্বীকার বা বিকল্প দাঁড় করানোর প্রতিযোগিতা না করে বরং তাঁর অবদানকে স্বীকার করে ইতিহাসের অন্যান্য নায়ক-নায়িকাদেরও যথাযথ মর্যাদা দেওয়া উচিত। একটি জাতির ইতিহাস বহুমাত্রিক; সেখানে একাধিক ব্যক্তিত্বের অবদান থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বের ভূমিকা আলাদা—কারণ তিনিই রাষ্ট্রের জন্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
বিশ্বের উদাহরণ আমাদের সামনে স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ঘানা, ইন্দোনেশিয়া—সব জায়গায় রাজনৈতিক মতভেদ আছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব নিয়ে মৌলিক ঐকমত্য আছে। আমাদের দেশেও সেই পরিপক্বতা প্রয়োজন। জাতির জনক নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে রাজনৈতিক লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অতএব, একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজন ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং জাতীয় ঐকমত্য। জাতির জনক কোনো দলীয় পরিচয়ের প্রতীক নন; তিনি রাষ্ট্রের জন্মের প্রতীক। তাঁকে সম্মান করা মানে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে সম্মান করা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যেমন তাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের সম্মান দিয়ে জাতীয় ঐক্য বজায় রেখেছে, তেমনি আমাদেরও উচিত নিজেদের ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করা। তাহলেই আমরা একটি পরিপক্ব, আত্মবিশ্বাসী ও ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।
#সবাই #জাতির #জনক #বাংলাদেশ #পৃথিবী