তিনি সুপরিচিত ছিলেন, সাংবাদিক কাশেম পাটোয়ারী নামে, পুরো নাম আবুল কাশেম পাটোয়ারী।
১৯৬৩ সালে ২২মে বাংলা ১৩৭০ সালের ফজর নামাজের পর জন্মগ্রহন করেন ,তৎকালিন কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমার মতলব থানায় টরকী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ।
পিতা নাম মিন্নত আলী পাটোয়ারী ও মাতা আনোয়ারা বেগম , তিন ভাই ও দু্ই বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। বড় ভাই ওয়াদুদ পাটোয়ারী, ছোট ভাই আবু তাহের পাটোয়ারী,সবার বড় বোন জাহানারা বেগম ও মেঝ বোন খায়রুনেসা।
নিজ গ্রামের ১৩০নং টরকী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু। এরপর কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে নন্দলালপুর সামাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে এস,এস,সি পাশ করেন। ১৯৮৪ সালে একই বোর্ডের অধীনে মতলব ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় মামলা দিয়ে তাকে আটক করে এবং এতে কিছুকালের জন্য শিক্ষাজীবন ব্যাহত করা হয়। তারপর ১৯৮৮ সালে আবুল কাশেম পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মতলব ডিগ্রি কলেজ হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ ২৮ বছর পরে ২০১৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পরিক্ষায় সম্মানের সাথে পাস করেন।
দশম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত থাকাকালীন সময় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে স্বক্রিয় ভাবে কাজ করেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য হিসাবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে তিনি বৃহত্তর মতলব উপজেলার বাংলাদেশ আওয়ামী ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্র রাজনীতির কারনে বার বার সামরিক শাষকের রোষানলে পড়েন এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনের মিথ্যা মামলায় তাকে জড়িয়ে দেয়া হত। এতে বহু দিন বন্ধি থাকার কারনে শিক্ষা জীবন অনেক ব্যাহত হওয়া সহ আর্থিকভাবে বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই সময় দীর্ঘ দিন তার বিরুদ্ধে চলা ষরযন্ত্রমূলক মামলাগুলো মিথ্যা প্রমানিত হয় এবং তিনি সকল মামলা থেকে বেখসুল খালাস পান।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী ১৯৮৪ সাল থেকে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হন এবং স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় অত্যন্ত সুনামের সহিত সাংবাদিকতা চালিয়ে যান। একজন নির্ভিক বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসাবে এই জন্য আজও তিনি গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে আছেন। তার এই নির্ভিক সাংবাদিকতার জন্য জীবনে চরম আত্মত্যাগ স্বীকারও করেছেন বহু। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বাংলার বাণীর পত্রিকায় নিজস্ব সংবাদদাতা হিসাবে তিনি দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী চাঁদপুর মতলব থেকে প্রকাশিত বহু পত্র–পত্রিকায়, সাময়িকী ও ম্যাগাজিনে লেখা লেখি করেছেন এবং এখনও তা অব্যাহত আছে দেশ বিদেশের বহু পত্র-পত্রিকা সহ অনলাইন পোর্টালে। তিনি মতলব থেকে প্রকাশিত প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা মতলব কন্ঠের উপদেষ্ঠা সম্পাদক ছিলেন।
বৃহত্তর মতলবের সূধীজনদের মতে মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃত হিসাবে সম্মানীত ছিলেন আমরণ।
রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আজকের মতলব পত্রিকার উপদেষ্ঠা সম্পাদক এবং দৈনিক একুশের বাণী পত্রিকার উপদেষ্ঠা সম্পাদক ছিলেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী বৃহত্তর মতলবে প্রথম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ক্ষমতাশীন মহলের বিরাগবাজন হন। তার একান্ত আগ্রহে ও ইচ্ছায় মতলবের প্রানকেন্দ্রে প্রেসক্লাবের জমির ব্যবস্থা করে সেখানে সাংবাদিকদের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করেন এবং তার আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করেন। মতলব প্রেসক্লাব এর সভাপতি থাকাকালিন নিজ উদ্যোগে মতলব প্রেসক্লাব এর সাংবাদিকদের কে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাসী আবুল কাশেম পাটোয়ারী সত্য প্রকাশে কখনো আপোষ করেননি।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রায় সব কয়টি জেলা ভ্রমন করেছেন।
চাঁদপুর মতলব থাকাকালিন সময়ে তিন সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমকালিন সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিয়মিত যোগদান করেছেন। আর পেশাকে কখনো তিনি রাজনীতির সাথে জড়াননি।
সাংবাদিক আবুল কাশেম পাটোয়ারী আশির দশকে মতলব থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হন, নববই এর দশকে মতলব থানা যুবলীগের এক নম্বর সদস্য এবং চাঁদপুর জেলা কৃষকলীগের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চাঁদপুর জেলা শাখার একজন সদস্য ছিলেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী বহু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নিজ গ্রামে থাকাকালিন সময়ে তিনি পল্লিমা সংসদ নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মতলবে ধনাগোদা খেলাঘর আসরের সভাপতি ছিলেন। অষ্টম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি নাটক করতেন এবং পরে তিনি মতলব থিয়েটারের সভাপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালিন সময়ে তার নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের পট ভুমিকায় ময়নার চর নাটকটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল ।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী মতলব ডিগ্রি কলেজে পরিক্ষার কেন্দ্র আনার জন্য ব্যাপক ভুমিকা পালন করেন। ১৯৯৬ সালে মতরবে নিউ হোষ্টেল মাঠে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভার্স্কয ”দীপ্তবাংলা” নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার একান্ত উদ্যোগে মতলবের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর একটি সংবর্ধনা প্রধান করেন। তার জন্মস্থান গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালণ করেন। তার একান্ত প্রচেষ্ঠায় তার গ্রামের প্রধান রাস্তাটি পাকাকরন হয় ও বহু ব্রীজ নির্মান করা হয় এবং বিদ্যুতায়ন করেন।
১৯৮৮ সালে মতলবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে প্রথমে খেলাঘর আসরের মাধ্যমে পরে আক্সফামের সহযোগিতায় নিউজিল্যান্ড ব্যাপটিস মিশনারীর চেয়ারম্যান পাউল থমসন সঙ্গে মতলবে ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রম চালান এবং বন্যা পরর্বিত সময়ে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বীজ ও গম বিতরন করেন। বিভিন্ন সময় তার পরিচালিত সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মতলবে বহু বছর যাবত বৃক্ষরোপন কর্মসূচি পালণ করেছিলেন। নিরিক্ষরতা দূরীকরনের জন্য তিনি মতলবে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করেছেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী ঢাকাস্থ মতলব বাসীদের সর্ববৃহত সংগঠন “আমরা মতলববাসী“ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে ছিলেন। তিনি সংগঠনটির সভাপতি থাকাকালীন মতলববাসীদের নিয়ে প্রতি বছর মিলণ মেলার আয়োজন করতেন। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে মতলবের প্রতিটি স্কুল এবং কলেজে বঙ্গবন্ধুর লেখা বই সহ অন্যান্য আরো গুরুত্বপূর্ণ বই বিতরন করতেন। মতলব ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ২০১৭-২০১৮ সালে মতলবের প্রতিটি স্কুল , কলেজ এবং প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রদান করেন।
মতলববাসীর মাধ্যমে মতলবের কৃতি ছাত্রছাত্রীদের কে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। সেই সাথে তার একান্ত ইচ্ছায় ও আগ্রহে বহু ছাত্র ছাত্রীকে পৃথিবীর অনেক দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রেরণ করেছেন। অনেক ছাত্র ছাত্রীদেকে বিদেশে বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী ঢাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন।
মতলবের পূর্বাঞ্চলে নারায়নপুর ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠার সময় প্রশাসনিক কাজে সর্বাত্মক সহযোগীতা ছিল তার। বর্তমানে মতলবে একটি “বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
পেশাগত কারনে তিনি ঢাকায় থাকলেও তিনি মতলবের মানুষের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন এই তিনি। মতলব থাকার সময়ে তিনি মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্প নিয়ে অনেক রির্পোট করেছেন। তার এই রিপোর্টের ভিত্তিতে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে সেসময়।
নারায়নগঞ্জ মতলব সারস লঞ্চ ডুবির পর তিনি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিয়েছিলেন। একজন সফল সংগঠক হিসাবে ও মানব হিতৈষী কাজের জন্য বিভিন্ন সংগঠন তাকে সম্মাননা প্রদান করেছিলেন।
সম্মাননা পাওয়া উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি সংগঠনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো। যথা,
তিনি জেলা শহর চাঁদপুর সমিতির গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী বাংলাদেশ পর্যটন আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিন যাবত জড়িত ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশ পর্যটন কন্সালটেন্ট সোসাইটি ও ইন্টারন্যাশনাল পর্যটন কনফেডারেশন এর সদস্য ছিলেন। এই পর্যন্ত তিনি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দিবসে বিভিন্ন সেমিনার শিম্পোজিয়ামে বক্তব্য রেখেছেন এবং নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন ও স্মৃতিক্তব্য দিয়েছেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারী সবসময় নিজেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন আদর্শের সৈনিক হিসাবে চিন্তা করতেন ও সেই মত মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন।
তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেলা শাখার একজন সদস্য ছিলেন। মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্প বাস্থবায়নে তিনি পানি উন্নইয়ন বোর্ডের সাথে বিভিন্ন কাজের উন্নয়নের স্বার্থে যোগাযোগ রাখতেন।
আবুল কাশেম পাটোয়ারীর নেতৃত্বে ’৯০ এর দশকে মতলব উন্নয়ন ফোরামের ব্যানারে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করে মতলবের ঐ সময়কার সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন।
তিনি যে সকল পত্রিকায় নিয়মিত কাজ করেছেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন :
বার্তা সম্পাদক : দৈনিক বাংলাদেশের আলো
বাংলার বাণী (নিজস্ব সংবাদ দাতা)
উপদেষ্ঠা সম্পাদক : সাপ্তাহিক মতলব কন্ঠ
উপদেষ্ঠা সম্পাদক : সাপ্তাহিক আজকের মতলব
উপদেষ্ঠা সম্পাদক : দৈনিক একুশের বাণী।
তার সম্পাদিত স্যুভেনিড় :
মৃত্যু পূর্বক পর্যন্ত তিনি প্রধান সম্পাদক হিসাবে অনলাইন পোর্টাল বাতায়ন24.কম এ দায়িত্বরত ছিলেন যা পরবর্তিতে বাতায়ন24নিউজ.কম নামে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক সংগঠন :
সাবেক সদস্য : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
সাবেক সভাপতি : জাতীয় ছাত্রলীগ মতলব উপজেলা
সাবেক সদস্য : আওয়ামী যুবলীগ মতলব উপজেলা
তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক : বাংলাদেশ কৃষকলীগ।
সদস্য : বাংলাদেশ জেলা আওয়ামী লীগ।
সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন :
১। সাবেক সভাপতি : পল্লিমা সংসদ
২। সভাপতি : মতলব থিয়েটার
৩।সাবেক সভাপতি : ধনাগোদা খেলাঘর আসর
৪। সাবেক সভাপতি : মতলব প্রেসক্লাব
৫। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি : আমরা মতলববাসী
৬। আজীবন সদস্য : চাঁদপুর সমিতি
৭। সদস্য : বাংলাদেশ সাব এডিটর ফোরাম
৮। সদস্য : বাংলাদেশ পর্যটন কন্সালটেন্ট সোসাইটি
৯। সদস্য : ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম কনফেডারেশন
১০।উপদেষ্ঠা : জয় বাংলা সাংস্কৃতিক পরিষদ
১১। সদস্য : ঢাকা সামাজিক সাংস্কৃতিক শিল্পগোষ্ঠি
১২। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি : মতলব ফাউন্ডেশন
১৩। সাবেক সভাপতি : মুক্তিযোদ্ধা যুব কমান্ড
১৪। সদস্য : বাংলাদেশ বিনোদন সাংবাদিক সমিতি।
তার জীবনের সেরা উক্তি ছিলো, “কাজ করে যাও সকল প্রয়োজনে তাকে ডাকো।”
আবুল কাশেম পাটোয়ারী ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর মৃত্যুরবণ করেন।