June 24, 2026, 7:55 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

Reporter Name

দেশে বর্তমানে আইনের শাসন নির্বাসনে

দেশে আজ যে কথাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়—তা হলো আইনের শাসন। কিন্তু একই সঙ্গে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত, সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ, সবচেয়ে বেশি আক্ষেপের জন্ম দেয়, তার মূলেও এই একই শব্দ। আইনের শাসন—এমন একটি ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্র নিজেকে সভ্যতার মানদণ্ডে তুলে ধরে, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে নিশ্চিত করে, ন্যায়বিচারের পথ প্রসারিত করে। আজ সেই ভিত্তিই যেন ধসে পড়েছে, বা বলা ভালো—ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা স্বার্থ, চাপ, প্রতিহিংসা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের দৌরাত্ম্যে। ফলে দেশে আইনের শাসন যেন নির্বাসনে—এমন এক নির্বাসন, যার শেষ কবে হবে তা কেউ জানে না, আর কেউ জিজ্ঞেস করারও সাহস পায় না।

আইনের শাসনের প্রয়োগ তখনই সম্ভব যখন আইন সমানভাবে সবার ওপর প্রযোজ্য হয়, ক্ষমতা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে কারো জন্য আলাদা ব্যাখ্যা তৈরি হয় না, বিচার স্বচ্ছ ও স্বাধীন থাকে, আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকে। কিন্তু বাস্তবতা দেখলে দেখা যায়, এই মৌলিক শর্তগুলোর একটিরও যথাযথ অনুপস্থিতি নয়—বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে সুস্পষ্ট ক্ষয় এবং ভয়াবহ অবক্ষয়। এ কারণে মানুষ আজ শুধু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত নয়; বরং ন্যায়বিচার চাইবার অধিকারটিও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অধিকারটি আছে কাগজে, সংবিধানে, আদালতের রায়ে—কিন্তু বাস্তব জীবন তা মানছে না, মানার সুযোগও দিচ্ছে না।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল আইনের শক্তি—যেখানে আইন অন্য সব শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, আইনই হবে চূড়ান্ত। অথচ এখন শক্তিই হয়ে উঠেছে আইন। ক্ষমতার শক্তি, প্রশাসনের শক্তি, রাজনৈতিক দলের শক্তি, আধিপত্যবাদের শক্তি—এই সব শক্তিই আইনকে ছাপিয়ে উঠে এসেছে। আইন যেন এখন শুধু একটি প্রতীক, যা আছে সংবিধানে, শোভাময় বাক্যে, দিবস উদ্যাপনে; কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে তার অস্তিত্ব দুর্বল, ক্ষীণ, এবং অনেক সময় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ফলে দেশের সাধারণ জনগণ আইনের কাছে নয়—ভাগ্যের কাছে নিজেদের ফেরত দিয়েছে। আইনের শাসন যখন নির্বাসনে যায়, তখন নাগরিকের জীবনে একটি অদৃশ্য আতঙ্ক বাসা বাঁধে। মানুষ জানে না, কখন কোন কারণে সে অভিযুক্ত হয়ে যাবে, কোন মামলার ফাঁদে জড়িয়ে পড়বে, কোন থানায় গিয়ে শিকার হবে অনিয়মের, কোন নিম্ন আদালতে কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পাওয়ার পরিবর্তে বছরের পর বছর ধরে তার মামলা ঝুলে থাকবে। একটি সমাজে আইনের শাসন না থাকলে মানুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, আর এই ভাঙন রাষ্ট্রের মনোবল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রেও দেখা দেয় অস্থিরতা, বিভাজন, এবং এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা।

আজ দেশের বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অবাধ ক্ষমতার কাছে বন্দী। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের রক্ষক; কিন্তু আইনের শাসন না থাকলে তারাই হয়ে ওঠে ভয়ের প্রতীক। গুম, খুন, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্যাতন, স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন—এসব শব্দ এখন যেন নিত্যদিনের সংবাদ। অথচ একটি দেশ তার সভ্যতার পরিচয় দেয় মানবাধিকারের সর্বোচ্চ সম্মান নিশ্চিত করে, আইনের সামনে সকলের সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কিন্তু সেই সমতা এখন কাগজের বাণী—বাস্তবে তা কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শত্রু। যখন কোনো রাষ্ট্র আইনের প্রয়োগকে রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার বানায়, তখন আইন আর নিরপেক্ষ থাকে না। সে হয়ে ওঠে ক্ষমতার দাস, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষিপ্ত শাণিত অস্ত্র। বিরোধী মত দমনে, সামাজিক সমালোচকদের ভয় দেখাতে বা সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে যখন আইন ব্যবহার করা হয়, তখন সেই আইনের মর্যাদা ধ্বংস হয়। রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ গহীন অন্ধকারে হারিয়ে যায়। ফলে জনগণ আর আইনের সাহায্য নিতে চায় না, বরং আইনের নাম শুনলেই সন্দেহ করে আতঙ্কে সরে যায়।

একটি সমাজে এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষ। ধনী, ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী মানুষরা আইনের ফাঁক খুঁজে নেয়, আইনকে নিজের অনুকূলে ব্যাখ্যা করে নেয়, এমনকি প্রয়োজনে আইনকে নিজের জন্য ব্যবহার করানোর সক্ষমতাও রাখে। কিন্তু প্রান্তিক মানুষদের সামনে এসব সুযোগ নেই। তাদের জন্য আদালত মানে দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা মামলা, অসহায়ত্ব, অর্থনৈতিক ক্ষয়, এবং ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা—যে অপেক্ষার শেষ অনেক সময় জীবদ্দশায়ও আসে না। আইনের শাসন যখন নির্বাসনে থাকে, তখন সবচেয়ে বেশি নির্বাসিত থাকে সাধারণ মানুষের অধিকার। সংবিধানের মূল আত্মা ছিল—“প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতা জনগণের”—কিন্তু আজ বাস্তবে মনে হয় জনগণ নয়, ক্ষমতাই প্রজাতন্ত্রের মালিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার জায়গায় এসেছে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান আর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পায় না। কর্মকর্তারা জানেন, নিয়ম আইন সবই আছে—কিন্তু তাদের ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে অঘোষিত নির্দেশে। ফলে আইন বইয়ের নিয়ম নয়—ব্যক্তির ইচ্ছা হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের ভিত্তি। এর ফলে আইনের শাসন নির্বাসনে গিয়ে পড়ে, আর তার ফলে রাষ্ট্র কাঠামোতেই তৈরি হয় বিপজ্জনক ফাটল।

আইনের শাসন অকার্যকর হলে অর্থনীতি পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়। বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ কোনো বিনিয়োগকারী নিরাপত্তা ছাড়া অর্থ ঢালতে চান না। আদালতের ধীরগতি, দুর্নীতি, ঘুষ, অনিশ্চয়তা—এসব বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার জায়গা দখল করে নেয় রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ। পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় চাটুকারিতা ও পক্ষপাত। দেশের অর্থনৈতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে রূপ নেয় স্বার্থান্বেষী মুষ্টিমেয় মানুষের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে। ফলে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের উন্নয়ন থমকে যায়, মানুষের জীবনমান স্থবির হয়ে পড়ে, আর দুর্নীতির বিস্তার ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

মিডিয়ার স্বাধীনতাও আইনের শাসনের অন্যতম স্তম্ভ। যখন সংবাদপত্র সত্য প্রকাশ করতে ভয় পায়, সাংবাদিকেরা নির্যাতন, মামলা, বহিষ্কারের হুমকির মুখে পড়ে, তখন সমাজ সত্য জানতে পারে না। সত্য জানতে না পারলে মানুষ নিজের অধিকার রক্ষা করতে পারে না। আর সত্য যখন চাপা পড়ে, তখন অপরাধীরা সাহসী হয়, আর আইনের শাসন আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় গণমাধ্যম যে সন্তর্পণে হাঁটে তা অস্বাভাবিক নয়। কারণ সত্য বলার মূল্য যে কত তীব্র, তা তারা প্রতিদিনই চর্মচক্ষুতে দেখে। আইনের শাসন নির্বাসিত হলে সত্যও নির্বাসিত হয়ে পড়ে, আর রাষ্ট্রে তার স্থান নেয় প্রভাবশালী বয়ানের একচ্ছত্র আধিপত্য।

নির্বাচন ব্যবস্থাও আইনের শাসনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। একটি সুষ্ঠু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই রাষ্ট্রে জনগণের মত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু যখন নির্বাচন অবিশ্বস্ত, অস্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত বা পূর্বনির্ধারিত হয়ে ওঠে, তখন জনগণের ক্ষমতা হরণ হয়। নির্বাচনের ওপর আস্থা না থাকলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর বৈধতা না থাকলে রাষ্ট্রে শক্তিশালী বিরোধিতা তৈরি হয়, যা সমাজকে অস্থিতিশীল করে। ফলে আইনের শাসন আরও দূরে চলে যায়। নাগরিকেরা তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর নিরপেক্ষ মনে করতে পারে না, বরং মনে করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একটি দলের, একটি গোষ্ঠীর বা একটি স্বার্থশ্রেণীর হাতের যন্ত্র।

আইনের শাসন নির্বাসনে গেলে দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে হতাশা তৈরি হয়। তারা দেখে—যোগ্যতা নয়, সুযোগ নির্ধারণ করে প্রভাবশালী পরিচয়; মেধা নয়, দরকার হয় সুপারিশ; ন্যায় নয়, দরকার হয় সম্পর্ক; আইন নয়, কাজ করে শক্তি। এর ফলে একটি জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন দেখবে তাদের স্বপ্নগুলো ক্ষমতার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে, তখন তারা দেশপ্রেম হারাবে, আত্মবিশ্বাস হারাবে, এবং অনেকেই দেশ ছাড়ার স্বপ্ন বুনবে। রাষ্ট্রের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ সংকটের জন্ম দেয়। আইনের শাসন কখনো কেবল আদালতের বিষয় নয়—এটি একটি সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি সততা, ন্যায়, সমতা ও জবাবদিহিতার ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু আজ সেই সাংস্কৃতিক ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে। সমাজে যেন নৈতিকতার চেয়ে ব্যক্তিপূজা, আইনের চেয়ে সম্পর্ক, সিস্টেমের চেয়ে ব্যক্তিমানুষের ইচ্ছাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আর এই পরিবেশে আইনের শাসন নির্বাসনে যাওয়া ছাড়া আর কোনও ভাগ্য থাকে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যেভাবে নিয়ম ভাঙাকে নিয়ম বানিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাতে মনে হয়—আইন মানার চেয়ে আইন ভাঙা আজ সহজ, দ্রুত, লাভজনক এবং নিরাপদ। একটি সমাজে এই মনোভাব তৈরি হলে আইনের শাসন মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যায়।

আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে শুধু নীতি সংশোধনই যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নৈতিকতার পুনঃস্থাপন, প্রশাসনিক স্বাধীনতা, বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং জনগণের সচেতনতা। এগুলো ছাড়া আইনের শাসন কখনো পুনরুজ্জীবিত হতে পারে না। রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে আইন তাদের সুবিধার জন্য, তাদের সুরক্ষার জন্য, তাদের ক্ষমতা স্থায়ী করার জন্য—তাহলে আইনের শাসনের ধারণা রাষ্ট্রীয় নথিতে থাকলেও বাস্তবে তা কখনো ফিরে আসবে না। রাষ্ট্রকে তাই প্রথমে নিজেকে সংশোধন করতে হবে, নিজের কাঠামোকে ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে এবং জনগণকে তাদের প্রকৃত মালিক হিসেবে সম্মান করতে হবে।

আইনের শাসন নির্বাসনে থাকলে রাষ্ট্রের সর্বনাশ নিশ্চিত—এ কথা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে। রোম সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক বিশ্বের বহু রাষ্ট্র আইনি অবক্ষয়ের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তাই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা এখন শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়—এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখতে হলে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। আর সেই পথ খুবই কঠিন, কারণ ক্ষমতার লোভ মানুষের মধ্যে এমন একটি অন্ধকার তৈরি করে যা তাকে আইন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার—সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখার প্রলোভন দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের হয়, তাহলে এই অন্ধকারকে ভেদ করে আলো ফিরে আসতেই হবে।

আজ তাই জরুরি প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি এই নির্বাসনের শেষ টানতে প্রস্তুত? মানুষ কি ন্যায়বিচারের মূল্য বুঝতে পারবে? ক্ষমতাবানরা কি নিজেদের সীমা স্বীকার করবে? প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিজেদের হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে লড়াই করবে? আর জনগণ কি তাদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হবে? যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়, তাহলে আইনের শাসনের নির্বাসন অবশ্যই শেষ হবে। নাহলে সামনে অপেক্ষা করবে আরও অস্থিরতা, আরও অবক্ষয়, আরও অনিশ্চয়তা। দেশকে স্বাভাবিক পথে ফেরাতে হলে আইনকে আবার রাজা করতে হবে—মানুষ, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতাকে নয়। আইনই হবে শেষ কথা, আইনই হবে সবার জন্য সমান, আইনই হবে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। কারণ আইন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না; আর ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো সমাজ বেঁচে থাকতে পারে না। যে দিন এই সত্যকে রাষ্ট্র পুনরায় উপলব্ধি করবে, সে দিনই আইনের শাসন তার নির্বাসন থেকে ফিরে আসবে। মানুষ আবার আশ্বস্ত হবে, রাষ্ট্র আবার মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক হবে, আর সমাজ ফিরে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য।

আইনের শাসন শুধু একটি প্রশাসনিক নীতি নয়—এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা। সেই আত্মমর্যাদা আজ আহত, আহত রাষ্ট্রও। তাই রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি নির্বাসনেই থাকতে চায়, নাকি ফিরে পেতে চায় ন্যায় ও সত্যের আলো? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ, নির্ধারণ করবে জনগণের অধিকার, নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং আগামী প্রজন্মের জীবন। যদি রাষ্ট্র সাহস করে আইনের শাসনের পথে ফিরে আসে, তাহলে একটি নতুন ভোর অপেক্ষা করবে। আর যদি সাহস না করে, তাহলে অন্ধকার আরও দীর্ঘ হবে। সে অন্ধকারে হারাবে রাষ্ট্র, হারাবে মানুষ, হারাবে ন্যায়বোধ, হারাবে একটি জাতির সম্ভাবনা।

আইনের শাসনের নির্বাসন রাষ্ট্রের জন্য অমঙ্গল; আর আইনের শাসনের প্রত্যাবর্তনই দেশের জন্য একমাত্র পথ। এখন শুধু প্রয়োজন—রাষ্ট্রের, জনগণের, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের জন্য সেই পথ বেছে নেওয়ার সৎ এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা