চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘনা ধনাগোদা বেড়িবাঁধ সড়কের দু’পাশজুড়ে ফুটে থাকা শুভ্র সাদা ভাঁট ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের চোখ জুড়াচ্ছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ, চরাঞ্চল, পরিত্যক্ত মাঠ কিংবা জলাশয়ের পাড় সবখানেই অযত্নে-অবহেলায় স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা এই বুনো ফুল প্রকৃতিকে যেন নিজ হাতে সাজিয়ে তুলেছে।
গ্রামবাংলার বহুল পরিচিত বহুবর্ষজীবী এই উদ্ভিদটি অঞ্চলভেদে ভাইটা ফুল, ঘেটু ফুল, ভাত ফুল, বনজুঁই বা ঘণ্টাকর্ণ নামেও পরিচিত হলেও মতলব উত্তরে এটি ‘ভাঁট ফুল’ নামেই বেশি পরিচিত। চৈত্র মাসে বেশি ফোটে বলে অনেকেই একে ‘চৈত্রের ফুল’ বলেও ডাকেন। বসন্তের আগমনে পলাশ-শিমুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফাল্গুন ও চৈত্র জুড়ে এই ফুলের শোভা প্রকৃতিকে করে তোলে রঙিন ও সুরভিত।
জানা গেছে, ভাঁট ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum viscosum এবং ইংরেজি নাম Hill Glory Bower Flower। এর আদি নিবাস ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার অঞ্চল। আগে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর দেখা গেলেও বর্তমানে এই ফুলের বিস্তার কমে গেছে এবং অনেক স্থানে এটি দুর্লভ হয়ে উঠছে।
ফুলপ্রেমি ও নাউরী আহাম্মদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম তাজুল ইসলাম জানান, একসময় গ্রামবাংলার সর্বত্র ভাঁট গাছ দেখা যেত এবং মানুষ এর ভেষজ গুণাগুণ সম্পর্কে জানত। গাছটি সাধারণত ২ থেকে ৪ মিটার উঁচু হয়, পাতার দৈর্ঘ্য ৪ থেকে ৭ ইঞ্চি। পাতা কিছুটা পানপাতার মতো হলেও খসখসে। ডালের শীর্ষে পুষ্পদণ্ডে একের পর এক ফুল ফোটে, যার পাপড়ি সাদা এবং মাঝে বেগুনি আভা থাকে। রাতে এ ফুলের মিষ্টি সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে, যা মৌমাছিকেও আকর্ষণ করে।
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক সফিকুল ইসলাম জানান, ভাঁট ফুল ও পাতার রয়েছে নানা ভেষজ গুণ। বিষাক্ত প্রাণীর কামড়ে ফুলের রস ক্ষতস্থানে দিলে উপকার পাওয়া যায়। অনেকেই কৃমিনাশক হিসেবে এর রস পান করেন। চর্মরোগে ফুলের রস ব্যবহারে উপকার মেলে এবং গবাদিপশুর শরীরে উকুন হলে ভাঁট পাতার পেস্ট ব্যবহার করলে তা দূর হয়। তবে আধুনিক প্রজন্ম এ গাছের উপকারিতা সম্পর্কে তেমন জানে না বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন “মতলবের মাটি ও মানুষ”-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. শামীম খান বলেন, ভাঁট একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর ফুল শুধু সৌন্দর্যই নয়, সুগন্ধ ছড়িয়ে মনকেও প্রফুল্ল করে। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি এ ধরনের দেশীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা জরুরি।
প্রকৃতির এই নিঃশব্দ সৌন্দর্য এখন বেড়ীবাঁধ সড়কজুড়ে পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে। অনেকেই থেমে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, ছবি তুলছেন, আর প্রকৃতির এই অনাড়ম্বর সাজে মুগ্ধ হচ্ছেন।